শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম
ফুলবাড়ীর দৌলতপুরে বাড়ীতে ঢুকে লুটপাট ও মারপিট, থানায় অভিযোগ॥ অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ফুলবাড়ীর কাজিহাল ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ১১ সদস্যের অনাস্থা পাহাড়ে সিন্ডিকেট চক্র কর্তৃক উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল; রাঙামাটিতে সাড়ে ৩ হাজার ঘনফুট কাঠ জব্দ নিরাপত্তা জোরদার করণে নওগাঁ শহরে এআই ক্যামেরা ভালোয় ভালোয় সিফাতকে ছেড়ে দেন, সরকারকে হুঁশিয়ারি জামায়াত আমিরের ২০১৩ সালের চুক্তির আওতায় হাসিনাকে কি ফেরত পাঠাবে ভারত আজ জনপ্রিয় অভিনেতা পঙ্কজ ত্রিপাঠীর জন্মদিন অস্ট্রেলিয়ায় শাবনূরের আতিথেয়তায় মুগ্ধ তাসকিন ইয়াশ ও তটিনীর ‘কাবিননামা’ প্রকাশ্যে মারা গেছেন জাপানের সবচেয়ে প্রবীণ নারী, বয়স হয়েছিল কত?

অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ফুলবাড়ীর কাজিহাল ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ১১ সদস্যের অনাস্থা

মোঃ আফজাল হোসেন, ফুলবাড়ী, দিনাজপুর প্রতিনিধি ।
  • Update Time : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৭ Time View

মোঃ আফজাল হোসেন, দিনাজপুর প্রতিনিধি : হদিস মিলছেনা সাড়ে ১২ লাখ টাকার, রাজস্ব ব্যাংকে টাকা জমা হয়নি, ক্যাশ বইয়েও নেই হিসাব, বনবিভাগের ৭ লাখ টাকার প্রকল্প নিয়ে অনিয়ম, ভুয়া ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ । কাজীহাল ইউনিয়ন পরিষদের নামে রাজস্ব আদায় করা হলেও সেই অর্থের হদিস নেই পরিষদের ব্যাংক হিসাবে। এমন কি ক্যাশ বইয়েও জমার কোনো হিসাব নেই।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হোল্ডিং ট্যাক্স ও রিকশা-ভ্যানের লাইসেন্স বাবদ প্রায় ৯ লাখ টাকা এবং চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আরও প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা। তাঁদের হিসাবে, দুই খাতে মোট আদায়ের পরিমাণ প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু এই অর্থের কতটা আদায় হয়েছে, কোথায় রাখা হয়েছে এবং পরিষদের ব্যাংক হিসাবে কেন তা জমা হয়নি-এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মিলছে না।

এই আর্থিক হিসাব নিয়েই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ৩ নম্বর কাজিহাল ইউনিয়ন পরিষদ। পরিষদের ১১ জন নির্বাচিত সদস্য একযোগে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো.কাঞ্চন মিয়ার বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ শুধু রাজস্বের অর্থ নিয়ে নয়, বন বিভাগের প্রায় ৭ লাখ টাকার একটি প্রকল্পে অনিয়ম, ভুয়া ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহার করে অর্থ আদায়, সদস্যদের প্রায় ১৬ মাসের সম্মানী ভাতা বকেয়া রাখা এবং পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ নথি দেখতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এদিকে অভিযোগের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে উপজেলা প্রশাসনের হিসাব পরিদর্শনের পর। গত ১৩ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ হাসান কাজিহাল ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব পরিদর্শন ও অডিট করেন। সেখানে বিভিন্ন অসংগতি পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টসূত্র জানিয়েছে। পরে ভারপ্রাপ্ত সচিব আমিনুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

রাজস্বের ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন গত ২৩ আগস্ট সদস্য মো.খাজানুর ইসলামকে আহ্বায়ক করে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোঃ.কাঞ্চন মিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজন প্রীতিসহ বিভিন্ন অসংগতির অভিযোগ এনে ১১ জন নির্বাচিত সদস্য স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অনাস্থা প্রস্তাব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হোল্ডিং ট্যাক্স ও রিকশা-ভ্যানের লাইসেন্স বাবদ প্রায় ৯ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত একই খাতে আরও প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় হয়েছে বলে দাবি সদস্যদের। সব মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায়ের কথা বলা হলেও অভিযোগ, এই অর্থ ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়নি। ক্যাশ বইয়েও ওই অর্থ জমার হিসাব নেই।

কাজিহাল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সচিব আমিনুল ইসলাম বলেন, হোল্ডিং ট্যাক্স ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাঁর নিজস্ব লোকজন দিয়ে আদায় করেছেন। তাঁরা অফিসের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। সচিবের এ বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে-কারা ওই অর্থ আদায় করেছেন, তাঁদের কাছে কোনো রসিদ বা আদায়ের হিসাব ছিল কি না, মোট কত টাকা আদায় হয়েছে এবং আদায় করা অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় রাখা হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ আগস্ট ইউএনও আহমেদ হাসান কাজিহাল ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব পরিদর্শনে যান। তখন পরিষদের হিসাব-নিকাশে বিভিন্ন অসংগতি ধরা পড়ে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিশেষ করে হোল্ডিংট্যাক্স থেকে আদায় করা রাজস্ব ব্যাংক হিসাবে জমা না দেওয়ার বিষয়টি নজরে আসে। ক্যাশ বইয়েও ওই অর্থ জমা দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর ভারপ্রাপ্ত সচিব আমিনুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

তবে এ ঘটনায় দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়টি ও সামনে এসেছে। আমিনুল ইসলাম জানান, গত ১ জুন অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়ার সময় আগের সচিব সাজ্জাদ হোসেন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও হিসাবের ফাইল তাঁকে বুঝিয়ে দেননি। সাবেক সচিব সাজ্জাদ হোসেন অবশ্য ফাইল বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, দু-এক দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র বুঝিয়ে দেবেন। ফলে পরিষদের আর্থিক নথি ও হিসাব দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় যথাযথভাবে বুঝে নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বন বিভাগের প্রকল্প নিয়েও অভিযোগ রাজস্বের হিসাবের পাশাপাশি বন বিভাগের অর্থায়নে একটি প্রকল্প নিয়েও অভিযোগ করেছেন ইউপি সদস্যরা। তাঁদের দাবি, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে মিরপুর জলস্বরি এলাকায় বন বিভাগের মাধ্যমে প্রায় ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে কাজ না করে বা ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে ওই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের। তবে এ অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রকল্পের অনুমোদন, বরাদ্দপত্র, ব্যয়ের হিসাব, বাস্তবায়ন-সংক্রান্তনথি এবং মাঠ পর্যায়ে কাজ হয়েছে কি না-এসব যাচাই করা হলে অভিযোগটির সত্যতা স্পষ্ট হবে।

ভুয়া ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহারের অভিযোগ হোল্ডিংট্যাক্স আদায়ের সময় ভুয়া ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহার করে ইউনিয়ন বাসীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন সদস্যরা। তাঁদের দাবি, পরিষদের প্রচলিত রাজস্ব আদায় ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে এসব কার্ড ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তানিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ব্যবহৃত কার্ড, রসিদ, আদায়কারীদের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট অর্থের হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১৬ মাসের সম্মানী ভাতা বকেয়া ইউপি সদস্যদের অভিযোগের আরেকটি অংশ তাঁদের সম্মানী ভাতা নিয়ে। সদস্যদের দাবি, তাঁদের প্রায় ১৬ মাসের সম্মানী ভাতা বকেয়া রয়েছে। ভাতা চাইতে গেলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অসদাচরণ করেন এবং ভাতা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান। পরিষদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখতে চাইলেও সহযোগিতা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সদস্যরা। রেজুলেশনখাতা, দাপ্তরিকনথি ও অন্যান্য কাগজপত্র দেখতে গেলে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এমন কি সদস্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে বলেও অনাস্থা প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিরোধের অভিযোগ কাজিহাল ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে রাজনৈতিক সমীকরণ ও কাজ করছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা। তাঁদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তৎকালীন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক প্রয়াত তোফায়েল হোসেন চৌধুরীর সমর্থনে আওয়ামীলীগ নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মানিক রতনের অনুপস্থিতিতে মোঃ কাঞ্চন মিয়া ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।

তাঁদের দাবি, তোফায়েল হোসেন চৌধুরী জীবিত থাকা অবস্থাায় তাঁর রাজনৈতিক সমর্থন ও প্রভাবের কারণে মোঃ কাঞ্চন মিয়া দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর কাঞ্চন অন্যদের গুরুত্ব না দিয়ে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। তবে এসব রাজনৈতিক বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

চেয়ারম্যানের বক্তব্য অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো.কাঞ্চন মিয়ার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব টাকার হিসাব আছে। সব বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’সরকারি রাজস্বের অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা হয়নি কেন-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মিটিংয়ে আছি, পরে কথা বলব।’এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাসান বলেন, কাজিহাল ইউনিয়ন পরিষদের হিসাবের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত সচিবকে ইতিমধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইতো মধ্যে সচিবকে শোকজ করা হয়েছে। বিধি মোতাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কাঞ্চনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের ১১ সদস্যের অনাস্থা, রাজস্বের অর্থের হিসাব না থাকা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:৫৪

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit