আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ মার্কিন হামলায় ইরানে অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ১০৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে থাকা চারজনও রয়েছেন। ওই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৬৭ জন।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি একটি এলাকায় বিয়ের অনুষ্ঠান চলার সময় হামলার ঘটনা ঘটে। এতে হতাহতের পাশাপাশি বেশ কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান দাবি করেছে, বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত ও ইরাকে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সম্পদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরে কুয়েতের সেনাবাহিনীও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। দেশটির দাবি, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসব হামলা প্রতিহত করেছে।
জুলাইয়ে সংঘাতের সর্বশেষ বড় পর্বের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল। তবে এ সময়ে শান্তি আলোচনা নিয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও সামরিক পদক্ষেপ জোরদারের হুমকি দিয়েছেন। যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিরোধিতা থাকলেও সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির বরাত দিয়ে জানা গেছে, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ সহযোগী চেষ্টা করছেন। তবে নির্বাচনের পর সামরিক অভিযান আরও বাড়ানোর বিষয়টি হোয়াইট হাউস বিবেচনা করতে পারে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও ইরান তার অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ইরানে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনাটিও তাঁর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব দ্রুত সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, বেসামরিক মানুষের ওপর যেকোনো ধরনের হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করা, হামলার ক্ষেত্রে আনুপাতিকতা বজায় রাখা এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা সব পক্ষের দায়িত্ব।
ইরানের মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (হরানা) জানিয়েছে, ৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশটিতে সংঘাতে মোট ৩ হাজার ৬৩৬ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক। সর্বশেষ হামলায় নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা এর বাইরে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের হামলায় তাদের ১৮ জন সামরিক সদস্য নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেছেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বেসামরিক হতাহতের খবর সম্পর্কে তারা অবগত। তাঁর দাবি, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কখনো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।
এদিকে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করেছে। সেখানে একটি ভবনের ছাদে বড় ধরনের গর্ত এবং আশপাশে ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনকেও ঘটনাস্থলে দেখা যায়।
সংবাদমাধ্যম রয়টার্স স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে ঘটনাস্থল যাচাই করেছে। এতে দেখা গেছে, একটি ভেঙে পড়া ইউটিলিটি টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে প্রায় ১৩৬ মিটার দূরে ছিল।
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনাটি এর আগে মিনাবের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে বিস্ফোরণের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। সংঘাতের প্রথম দিন ওই ঘটনায় ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিনাবের হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরোনো তথ্য ব্যবহারের কারণে ওই হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা মিনাবের ঘটনায় তদন্তের ফলাফল প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তবে তাঁদের কাছে এখনো সেই প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজগুলোকে সতর্ক করেছে। ইরানের অনুমতি ছাড়া যেসব ট্যাংকার এই জলপথ ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা এবং হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দেশটির সহায়তা বন্ধ করাকে যুদ্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাশাপাশি ইরানের জনগণকে তাদের সরকার পরিবর্তনের জন্য উৎসাহিত করার কথাও বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
সংঘাত যতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সূত্র:রয়টার্স
কিউএনবি/অনিমা/০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সকাল ১১:৫২