লাইফ স্টাইল ডেস্ক : একসময় আমাদের পরিবারগুলোতে খাবারের সময়টি কেবল ক্ষুধা মেটানোর মাধ্যম ছিল না। খাওয়ার টেবিলে প্রবীণ, শিশু ও পরিবারের অন্য সদস্যরা একসঙ্গে বসতেন, সারাদিনের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতেন এবং একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগ করতেন।
তবে ব্যস্ত জীবনযাত্রা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পরিবর্তিত রুটিন, টেলিভিশন এবং স্মার্টফোনের বহুল ব্যবহারে সেই ঐতিহ্যে ক্রমশ পরিবর্তন এসেছে। পরিবারের সদস্যরা এখন অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বা আলাদা ঘরে বসে খাবার খান, এমনকি শিশুদের খাওয়ার সময়সূচিও গড়ে উঠেছে তাদের নিজস্ব নিয়ম মেনে। তবে সাম্প্রতিক নানা গবেষণা মানুষকে আবারও একই খাবার টেবিলে ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য উপকারিতাগুলোর দিকে নজর কাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা একত্রে বসে খাবার খাওয়ার এই চর্চাকে ‘কমেনসালিটি’ হিসেবে অভিহিত করেন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি ও আচরণগত বিজ্ঞানের অধ্যাপক জন ইমানুয়েল ডি নেভ-এর মতে, খাবার ভাগাভাগি করে নেওয়া মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলা, পারস্পরিক বিশ্বাস তৈরি এবং একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার অন্যতম মৌলিক উপায়। বেশ কয়েকটি গবেষণায় দলবদ্ধভাবে খাবার গ্রহণের সঙ্গে মানসিক সুস্বাস্থ্যের ইতিবাচক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
চীনের ঝেজিয়াং প্রোভিন্সিয়াল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের প্রবীণ নারীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের টেবিলে কতজন মানুষ একসঙ্গে বসছেন তার সঙ্গে বিষণ্নতার ঝুঁকির একটি প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। একইভাবে জাপানের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সি যেসব বয়োজ্যেষ্ঠ পরিবারে বাস করা সত্ত্বেও ঘন ঘন একা খাবার খান, নিয়মিত সবার সঙ্গে খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় তাদের বিষণ্নতার লক্ষণ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা পাঁচগুণ বেশি।
একত্রে খাওয়ার সঙ্গে ভালো থাকার সম্পর্কটি ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৪’-এর তথ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্বের প্রায় দেড় লাখ মানুষের ওপর পরিচালিত এই জরিপে দেখা যায়, যারা সপ্তাহে বেশিবার পরিচিত কারও সঙ্গে খাবার খেয়েছেন, তারা সার্বিকভাবে মানসিকভাবে বেশি ভালো অনুভব করছেন এবং নিজের জীবন নিয়ে তুলনামূলক বেশি সন্তুষ্ট।
অধ্যাপক ডি নেভ জানান, অন্যদের সঙ্গে খাওয়ার মাধ্যমে যে মানসিক সন্তুষ্টি আসে, তার মাত্রা কর্মসংস্থান কিংবা আয়ের মতো বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তবে গবেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই তথ্যগুলো সরাসরি প্রমাণ করে না যে একত্রে খেলে বিষণ্নতা বা একাকীত্ব দূর হয়, বরং এটি কোনো ব্যক্তির বিস্তৃত সামাজিক জীবন ও উন্নত সম্পর্কের প্রতিচ্ছবিও হতে পারে।
এ ছাড়া, যৌথভাবে খাবার খাওয়ার ইতিবাচক প্রভাব শুধু মানসিক সুস্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি খাবারের স্বাদ এবং মস্তিষ্কের গঠনেও প্রভাব ফেলে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রোপোলজিস্ট রবিন ডানবারের মতে, খাবার গ্রহণের প্রক্রিয়াটি শরীরে এন্ডোরফিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায়, যা আনন্দ ও তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে সামাজিক বন্ধন মজবুত করতে সাহায্য করে।
আবার ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ার গবেষকরা জানান, অন্য কারো উপস্থিতিতে যেকোনো খাবার খেলে তা বেশি সুস্বাদু ও উপভোগ্য মনে হয়। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে জাপানি গবেষকদের পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত একা খাবার খান, তাদের মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞানীয় ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের আকার তুলনামূলকভাবে ছোট। খাবারের টেবিলে পারস্পরিক কথোপকথন এবং মানসিক সহযোগিতা চাপ কমিয়ে মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।
বিশ্বজুড়ে দলবদ্ধভাবে খাবার খাওয়ার প্রবণতায় ব্যাপক ভিন্নতা দেখা যায়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাপানের মানুষ সপ্তাহে গড়ে ৪ বারেরও কম খাবার অন্যদের সঙ্গে খান, যেখানে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা ৭ থেকে ৮ বার এবং ইতালিতে প্রায় ৯। ইতালিতে একসঙ্গে খাবার খাওয়া পরিবারের বন্ধন ও সামাজিক জীবনের এতই অবিচ্ছেদ্য অংশ যে ইউনেস্কো ইতালীয় রন্ধনশিল্পকে ‘অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ব্যস্ত সময়সূচির কারণে যে পরিবারগুলো ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে খাচ্ছে, এই গবেষণাগুলো তাদের জন্য একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে টেবিলে বসা কেবল পেট ভরানোর বিষয় নয়, বরং এটি কথা বলা, সংযোগ এবং পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করার এক অমূল্য সুযোগ।
সূত্র: সামা টিভি
কিউএনবি/আয়শা/২৯ অগাস্ট ২০২৬,/বিকাল ৪:৪৪