আন্তর্জাতিক ডেস্ক : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বর্ষে গড়িয়ে গেলেও দুই দেশের সীমান্তরেখায় সংঘাতের গতিপ্রকৃতি খুব একটা বদলায়নি। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রণক্ষেত্রের বাইরে রক্তক্ষয়ী ড্রোন যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দুই দেশের সেনাবাহিনীই প্রতিপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর গলিয়ে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর খেসারত দিতে গিয়ে প্রতিদিন গৃহহীন হচ্ছে হাজারো মানুষ, প্রাণও হারাচ্ছেন দুই দেশেরই অনেক সাধারণ নাগরিক।
গত কয়েক দিনে এই ড্রোন হামলা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে রক্তক্ষয়ী উচ্চতায় পৌঁছেছে। সোমবার ইউক্রেনের প্রাণঘাতী ড্রোন হামলায় রাশিয়ার ভেতরে শিশুসহ অন্তত ১৩ জন নিহত হয়, যা এই যুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম মারাত্মক আক্রমণ। এর পরপরই রাশিয়ার পক্ষ থেকে আসা তোপ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভে পাঁচ সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। উভয় পক্ষই যখন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন ধ্বংসের মুখে পড়ছে ঘরবাড়ি ও জরুরি পরিষেবা।
চলতি বছরে ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রযুক্তির অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটেছে, যার মাধ্যমে তারা রাশিয়ার ভূখণ্ডের বহু গভীরে আঘাত হানতে সক্ষম হচ্ছে। একসময় শুধু তেল শোধনাগারে সীমাবদ্ধ থাকা সেই আক্রমণ এখন প্রসারিত হয়ে জ্বালানি অবকাঠামো, তেল ট্যাংকার এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত আঘাত হানছে। পাশাপাশি রাশিয়ার সামরিক সরবরাহের রুটগুলো বিচ্ছিন্ন করতে ড্রোনগুলোকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর।
রাশিয়ার বৃহত্তম ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ওয়াইল্ডবেরিজ-এর গুদামগুলোতে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। রাতভর ড্রোন হামলায় একের পর এক লজিস্টিক সেন্টার ধ্বংস হওয়ায় কোটি কোটি ডলারের পণ্যের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বেশ কয়েকজন কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। কিয়েভের দাবি, এই বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার সেনাদের রসদ জোগান দিয়ে সরাসরি যুদ্ধে সহায়তা করছিল। ফলে তারা এই নেটওয়ার্ককে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবেই বিচার করছে।
ইউক্রেনের এই অভিযানের পাল্টা জবাবে রাশিয়াও একই কায়দায় হামলা চালানো শুরু করেছে। ইউক্রেনের জনপ্রিয় অনলাইন মার্কেটপ্লেস রোজেটকা-এর বিশাল বিশাল গুদাম লক্ষ্য করে চালিয়েছে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা। রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক গুদামঘর আগুনে ভস্মীভূত হচ্ছে। এর ফলে বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতির পাশাপাশি প্রতিনিয়ত বাড়ছে অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনা, যা সাধারণ মানুষের আতঙ্ক বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউক্রেনে সাড়ে ৯ হাজারের বেশি মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। অন্যদিকে রাশিয়া দাবি করেছে যে তাদের সীমানায় প্রায় ৮০০ নাগরিক মারা গেছেন। তবে রাশিয়ার প্রতিদিন গড়ে দেড় শতাধিক আকাশ হামলার বিপরীতে ইউক্রেনের পাল্টা হামলার মাত্রা এখনও অনেক কম, যদিও দুই পক্ষেই যুদ্ধের নিষ্ঠুর প্রভাব স্পষ্ট।
ছোট আকারের এফপিভি ড্রোন ব্যবহার করে সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এতে জনমনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে। সম্প্রতি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, ইউক্রেনের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় এক সবজি বিক্রেতাকে ধাওয়া করে একটি ড্রোন বিস্ফোরণ ঘটায়। সামরিক বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু না হয়েও বেসামরিক নাগরিকরা এভাবে ব্যক্তিগত স্তরে শিকার হওয়ার ঘটনাকে ড্রোন সাফারি বলে আখ্যা দিচ্ছেন আতঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারা।
আমেরিকান প্যাট্রিয়ট ডিফেন্স সিস্টেমের সংকট এবং নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার স্থবিরতায় রক্তপাতের গতি থামার কোনো লক্ষণ নেই। শীর্ষ সম্মেলনের বৈঠক কিংবা ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক আলোচনা সত্ত্বেও বাস্তবে উভয় দেশের আকাশ নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনে কেঁপে উঠছে। যুদ্ধক্ষেত্র বিস্তৃত হয়ে এখন সাধারণ মানুষের ঘরের দুয়ারে এসে পৌঁছেছে, যার স্পষ্ট খেসারত দিচ্ছে নিরীহ মানুষ তাদের রক্ত দিয়ে।
সূত্র: এনডিটিভি
কিউএনবি/অনিমা/১০ অগাস্ট ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:১৭