বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫১ অপরাহ্ন

কাজের ঘণ্টা নয়, উৎপাদনশীলতাই হোক জাতীয় সমৃদ্ধির মাপকাঠি

শহীদ আহমদ খান সিলেট প্রতিনিধি ।
  • Update Time : শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬৮ Time View
শহীদ আহমদ খান সিলেট প্রতিনিধি : বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এমন এক পর্যায়ে অবস্থান করছে, যেখানে কেবল প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উন্নয়নের গুণগত মান নিশ্চিত করা। একটি দেশ কত দ্রুত এগিয়ে যাবে, কতটা প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলবে এবং কতটা টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করবে, তা নির্ভর করে তার উৎপাদনশীলতার ওপর। অর্থাৎ একটি সমাজ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র তার সময়, শ্রম, পুঁজি এবং সম্পদ ব্যবহার করে কতটা কার্যকর ফলাফল অর্জন করতে পারছে—সেটিই উন্নয়নের প্রকৃত সূচক।

আমাদের সমাজে কর্মমূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত মানসিকতা রয়েছে। আমরা প্রায়ই কোনো ব্যক্তির অবদানকে তার কর্মঘণ্টা, চাকরির মেয়াদ, পদমর্যাদা বা প্রতিষ্ঠানে কাটানো সময়ের ভিত্তিতে বিচার করি। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে এই ধারণা ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ উন্নয়ন নির্ভর করে না কে কত সময় ব্যয় করেছে তার ওপর; বরং নির্ভর করে সেই সময়ে কে কতটা ফলপ্রসূ অবদান রাখতে পেরেছে তার ওপর।

মানবসভ্যতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে জাতিগুলো উৎপাদনশীলতাকে গুরুত্ব দিয়েছে, তারাই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে গেছে। অন্যদিকে যেসব সমাজ কর্মের চেয়ে আনুষ্ঠানিকতা, ফলাফলের চেয়ে প্রক্রিয়া এবং দায়িত্বের চেয়ে সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, তারা দীর্ঘমেয়াদে পিছিয়ে পড়েছে। ধর্মীয় সাহিত্যেও কর্মের ফলপ্রসূতার গুরুত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বাইবেলের মথি রচিত সুসমাচারের ২০ অধ্যায়ে দ্রাক্ষাক্ষেত্রের শ্রমিকদের একটি দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয়েছে। সেখানে দিনের বিভিন্ন সময়ে কাজে যোগদানকারী শ্রমিকদের সমান পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়। এই দৃষ্টান্তের ধর্মীয় ব্যাখ্যা যেমন রয়েছে, তেমনি এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শিক্ষা নিহিত আছে—মানুষকে কেবল সময়ের পরিমাপে নয়, অবদান ও ফলাফলের আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত।

আজকের বাংলাদেশে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো উৎপাদনশীলতার ঘাটতি। আমরা অনেক সময় ব্যয় করি, অনেক পরিকল্পনা করি, অসংখ্য সভা-সেমিনার করি, কিন্তু প্রত্যাশিত ফলাফল সবসময় অর্জন করতে পারি না। অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় বৃদ্ধি পায়। প্রশাসনিক জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কাজের গতি মন্থর হয়ে পড়ে। ফলে সময় ও সম্পদের অপচয় ঘটে।

একটি উন্নয়ন প্রকল্প যদি তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকে কিন্তু সাত বছর লেগে যায়, তাহলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই হয় না; জনগণও দীর্ঘদিন কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। একইভাবে একটি সরকারি সেবা যদি কয়েক ঘণ্টায় দেওয়া সম্ভব হয়, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে, তাহলে সেটি রাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতার দুর্বলতারই প্রতিফলন।
উৎপাদনশীলতার প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতি বা প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি, সামাজিক উন্নয়ন এবং এমনকি ধর্মীয় ও মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

শিক্ষা খাতের কথাই ধরা যাক। আমাদের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করে, বিপুল অর্থ ব্যয় করে, অসংখ্য পরীক্ষা দেয়। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর বাস্তব দক্ষতার ঘাটতিতে ভোগে। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অংশ এখনও মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অথচ আধুনিক বিশ্বে সাফল্যের জন্য প্রয়োজন সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা। তাই শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল সনদ প্রদান নয়, দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরি করা।

স্বাস্থ্য খাতেও উৎপাদনশীলতার গুরুত্ব অপরিসীম। একজন চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীর মূল্যায়ন শুধু কর্মঘণ্টার ভিত্তিতে নয়; বরং তিনি কতটা কার্যকর ও মানবিক সেবা প্রদান করছেন, সেটির ভিত্তিতে হওয়া উচিত। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠীই একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভিত্তি। তাই স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন সরাসরি জাতীয় উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃষি খাতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

তবে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য কৃষিকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করতে হবে। একই জমিতে বেশি উৎপাদন, উন্নত বীজের ব্যবহার, যান্ত্রিকীকরণ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ—এসবই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উপায়। কৃষকের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতার প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।

প্রয়োজন দক্ষ শ্রমশক্তি, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প। যে দেশ প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক উৎপাদনে এগিয়ে যাবে, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নেতৃত্বও তার হাতেই থাকবে। বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল বহু দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে রয়েছে। জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার শক্তিতে। দক্ষিণ কোরিয়া কয়েক দশকের মধ্যে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি ও শিল্পশক্তিতে পরিণত হয়েছে। সিঙ্গাপুর সীমিত ভৌগোলিক পরিসর ও প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব সত্ত্বেও সুশাসন, দক্ষতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশাল জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও দেশটি উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্কৃতির ওপর জোর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তাদের সাফল্যের পেছনে অন্যতম শক্তি হলো কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং উৎপাদনমুখী মানসিকতা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম।

এই জনশক্তিকে যদি দক্ষ, উদ্ভাবনী এবং উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তাহলে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু যদি এই জনশক্তি বেকার, অদক্ষ বা কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রেও উৎপাদনশীলতার ধারণাটি প্রাসঙ্গিক। কোনো ব্যক্তি একটি প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে কত বছর কাটিয়েছেন, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। তিনি কতজনকে জ্ঞান, নৈতিকতা, সুস্বাস্থ্য, শান্তি, মানবিকতা এবং আত্মনির্ভরতার পথে পরিচালিত করেছেন। কারণ প্রকৃত সাফল্য সময়ের দৈর্ঘ্যে নয়, প্রভাবের গভীরতায় পরিমাপ করা হয়। আমাদের জাতীয় জীবনের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অজুহাতের সংস্কৃতি।

আমরা প্রায়ই সমস্যার কারণ ব্যাখ্যা করতে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু সমাধান বাস্তবায়নে ততটা আগ্রহী নই। উন্নত দেশগুলোও নানা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে—যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা সম্পদের সীমাবদ্ধতা। কিন্তু তারা সমস্যাকে অজুহাতে পরিণত না করে সমাধানের সুযোগে রূপান্তর করেছে। এ কারণেই তারা এগিয়ে গেছে। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে প্রতিযোগিতা মূলত উৎপাদনশীলতার প্রতিযোগিতা।

এখানে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো দক্ষ মানবসম্পদ। সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জ্ঞান। সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলো উদ্ভাবন। আর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করা। বাংলাদেশ যদি আগামী কয়েক দশকে উন্নত, সমৃদ্ধ এবং মর্যাদাবান রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তাহলে আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় উৎপাদনশীলতাকে শীর্ষে স্থান দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে যুগোপযোগী করতে হবে। প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে।

উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সর্বোপরি এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কর্মঘণ্টার চেয়ে কাজের ফলাফল বেশি মূল্য পাবে। জাতীয় সমৃদ্ধি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফল নয়; এটি একটি মানসিকতা, একটি কর্মসংস্কৃতি এবং একটি সামাজিক অঙ্গীকারের ফল। সেই অঙ্গীকারের কেন্দ্রে থাকতে হবে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন। আজ সময় এসেছে নতুনভাবে ভাবার। আমরা কতক্ষণ কাজ করেছি, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা কী অর্জন করেছি।

আমরা কত বছর কোনো পদে ছিলাম, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সময়ে আমরা কী পরিবর্তন এনেছি। আমরা কত পরিকল্পনা করেছি, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছি। যে জাতি এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে, তার উন্নয়নকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায় না। আর তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হওয়া উচিত—আমরা কত সময় ব্যয় করেছি, তা নয়; বরং আমরা কতটা উৎপাদনশীল হতে পেরেছি।

কিউএনবি/আয়শা/০৮ অগাস্ট ২০২৬,/বিকাল ৪:২২

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit