রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৪ অপরাহ্ন

সুদিনে ও দুর্দিনে মুমিনের করণীয় কী?

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ৭২ Time View

ডেস্ক নিউজ : মানুষের জীবন কখনো সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠে, আবার কখনো নেমে আসে দুঃখ, বিপদ ও কঠিন পরীক্ষা। এটাই দুনিয়ার স্বাভাবিক নিয়ম। ইসলাম শিক্ষা দেয়— সুদিনে অহংকার নয়, বরং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে; আর দুর্দিনে হতাশ না হয়ে ধৈর্য, নামাজ ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। কারণ একজন প্রকৃত মুমিন জানেন, জীবনের প্রতিটি অবস্থা আল্লাহর নির্ধারণ অনুযায়ী ঘটে এবং প্রতিটি পরীক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে কল্যাণ। কুরআন ও সুন্নাহ ধৈর্য, তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা) এবং দোয়ার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার অনন্য শিক্ষা দিয়েছে।

সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে

একজন মুমিন বিশ্বাস করেন, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া পৃথিবীতে কোনো কিছুই ঘটে না। তাই সুখে যেমন তিনি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করেন, তেমনি দুঃখ-কষ্টে তার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৩)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিপদের সময় দুটি শক্তিশালী অবলম্বনের কথা বলেছেন—ধৈর্য ও নামাজ।

আল্লাহর জিকির হৃদয়ের প্রশান্তির উৎস

যেমন শরীরের জন্য খাদ্য প্রয়োজন, তেমনি আত্মার জন্য প্রয়োজন আল্লাহর স্মরণ। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ

‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫২)

আরেক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন—

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা আর-রাদ: আয়াত ২৮)

ধৈর্য মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ

ইসলামে ধৈর্য শুধু বিপদে নীরব থাকা নয়; বরং আল্লাহর বিধানের ওপর অটল থাকা, ইবাদতে অবিচল থাকা এবং পাপ থেকে নিজেকে বিরত রাখাও ধৈর্যের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ

‘ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোনো নেয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (বুখারি ১৪৬৯, মুসলিম ১০৫৩)

মুমিনের প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর

সুদিনে শুকরিয়া, দুর্দিনে ধৈর্যই মুমিনের শক্তি। সুদিন ও দুর্দিন—উভয় অবস্থাই একজন মুমিনের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ…

‘মুমিনের অবস্থা সত্যিই বিস্ময়কর। তার প্রতিটি বিষয়ই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ পেলে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে— এটি তার জন্য কল্যাণকর। আর দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্য ধারণ করে— এটিও তার জন্য কল্যাণকর। আর এই সৌভাগ্য কেবল মুমিনেরই।’ (মুসলিম ২৯৯৯)

বিপদের সময় রাসুল (সা.)-এর শেখানো দোয়া

শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষার দোয়া

اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُورِهِمْ وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাঝআলুকা ফি নুহুরিহিম ওয়া নাউজুবিকা মিন শুরুরিহিম।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমরা তাদের মোকাবিলায় তোমাকেই আমাদের রক্ষাকবচ বানাচ্ছি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে তোমার আশ্রয় চাই।’ (আবু দাউদ ১৫৩৭)

বিপদে পড়লে পড়ার দোয়া

إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا

উচ্চারণ: ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাঝিউন, আল্লাহুম্মা ঝুরনি ফি মুসিবাতি ওয়াখলিফলি খাইরাম মিনহা।’

অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তার কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার এ বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন এবং এর পরিবর্তে আমাকে আরও উত্তম কিছু দান করুন।’ (মুসলিম ৯১৮)

দোয়া ইউনুস (আ.)

لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

উচ্চারণ: ‘লা ইলাহা ইল্লা আংতা সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজ জ্বলিমিন।’

অর্থ: ‘আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা আল-আম্বিয়া: আয়াত ৮৭)

এ দোয়ার ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম এ দোয়া করে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তা কবুল করেন। (তিরমিজি ৩৫০৫)

কঠিন কাজ সহজ হওয়ার দোয়া

اللَّهُمَّ لَا سَهْلَ إِلَّا مَا جَعَلْتَهُ سَهْلًا، وَأَنْتَ تَجْعَلُ الْحَزْنَ إِذَا شِئْتَ سَهْلًا

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা লা সাহলা ইল্লা মা ঝাআলতাহু সাহলান, ওয়া আংতা তাঝআলুল হাযনা ইজা শিই’তা সাহলান।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি যা সহজ করেন, তা ছাড়া কোনো কিছুই সহজ নয়। আর আপনি চাইলে কঠিন বিষয়কেও সহজ করে দেন।’ (ইবন হিব্বান ৯৭৪)

বিপদ মুমিনের গুনাহ মাফের কারণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ… حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ

‘মুসলমানের যে কোনো কষ্ট, রোগ, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, পেরেশানি, এমনকি শরীরে একটি কাঁটা বিঁধলেও আল্লাহ এর মাধ্যমে তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন।’ (বুখারি ৫৬৪১–৫৬৪২, মুসলিম ২৫৭৩)

ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর সুসংবাদ

আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ

‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে প্রদান করা হবে।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ১০)

আরও ইরশাদ হয়েছে—

سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرٍ يُسْرًا

‘অচিরেই আল্লাহ কষ্টের পর স্বস্তির ব্যবস্থা করে দেবেন।’ (সুরা আত-তালাক: আয়াত ৭)

এবং—

وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا أَصَابَكَ ۖ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ

‘তোমার ওপর যে বিপদ আসে, তাতে ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয়ই এটি দৃঢ়সংকল্পের কাজ।’ (সুরা লুকমান: আয়াত ১৭)

জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। কখনো তিনি সুখ দিয়ে বান্দার কৃতজ্ঞতা যাচাই করেন, আবার কখনো দুঃখ দিয়ে তার ধৈর্য ও ইমানের দৃঢ়তা পরীক্ষা করেন। একজন মুমিনের পরিচয় হলো—তিনি সুদিনে আল্লাহকে ভুলে যান না এবং দুর্দিনে তার রহমত থেকে নিরাশ হন না। নামাজ, দোয়া, জিকির, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসাই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে বড় শক্তি।

যে ব্যক্তি সব অবস্থায় রবের ওপর নির্ভর করে, আল্লাহ তাকে কখনো একা ছেড়ে দেন না। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত সুখে-দুঃখে, প্রাচুর্যে-অভাবেও আল্লাহর প্রতি আস্থা অটুট রাখা এবং তারই সন্তুষ্টি অর্জনের পথে অবিচল থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ এবং তাওয়াক্কুলকারী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/২৮ জুলাই ২০২৬,/রাত ১০:৫০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit