ডেস্ক নিউজ : নারীর পর্দা বলতে অনেকেই কেবল মাথার চুল ঢেকে রাখাকে প্রধান বা একমাত্র বিষয় বলে মনে করেন। অথচ ইসলামে পর্দার বিধান শুধু মাথা ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পোশাকের শালীনতা, সৌন্দর্য ও অলংকার প্রকাশ না করা এবং পরপুরুষের সামনে শরীরের কোন কোন অংশ উন্মুক্ত রাখা যাবে— এ সবের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ওপর পর্দার পূর্ণতা নির্ভর করে।
যদিও মুখ, হাত ও পায়ের বিধান নিয়ে ফকিহ বা ইসলামি আইনবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে, তথাপি পর্দার মূল দর্শনটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ব্যাপক। চলুন, কুরআন ও হাদিসের আলোকে নারীর পর্দার সামগ্রিক বিধান ও রূপরেখা জেনে নেওয়া যাক।
কুরআনে পর্দার মূল নির্দেশনা
পবিত্র কুরআনে নারীদের শালীনতা বজায় রাখা এবং নিজেদের সৌন্দর্য ঢেকে রাখার ব্যাপারে কঠোর ও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
১. কুরআনের উদ্ধৃতি
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ
‘আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণ প্রকাশ পায় তা ব্যতীত। তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল বুক ও গ্রীবার ওপর ফেলে রাখে।’ (সুরা নুর: আয়াত ৩১)
এই আয়াতে মুমিন নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখা, লজ্জাস্থান হেফাজত করা এবং নিজেদের গোপন অলংকার প্রকাশের উদ্দেশ্যে পায়ের আঘাতে শব্দ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
২. কুরআনের উদ্ধৃতি
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِزَوْجَاتِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ
‘হে নবী! আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়।’ (সুরা আহজাব: আয়াত ৫৯)
এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় ফকিহদের মধ্যে বিশেষ করে ‘যা সাধারণত প্রকাশ পায়’ এই অংশের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে।
শুধু মাথা ঢেকে রাখাই কি পর্দার একমাত্র রূপ?
না। মাথা ঢেকে রাখা নারীর পর্দার কেবল একটি অংশমাত্র। পর্দার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে পোশাকের শালীনতা, শরীর যথাযথভাবে আবৃত রাখা, অলংকার প্রদর্শন না করা এবং দৃষ্টি সংযত রাখার মতো বিষয়গুলো। তাই পর্দাকে শুধু মাথার চুল ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
হাত ও মুখ ঢাকার বিধান এবং ফিকহি মতভেদ
পরপুরুষের সামনে নারীর হাত ও মুখ ঢাকা আবশ্যক কি না, এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতভেদ রয়েছে—
হানাফি মাজহাবের মত: উপমহাদেশে অনুসৃত হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, নারীর পুরো শরীর সতরের অন্তর্ভুক্ত হলেও চেহারা ও দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত এর ব্যতিক্রম। অর্থাৎ নামাজের ক্ষেত্রে এগুলো ঢেকে রাখা ফরজ নয়। তবে পরপুরুষের সামনে চেহারা ও হাত প্রকাশের ক্ষেত্রে ফিতনার আশঙ্কাকে হানাফি ফকিহরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। এ কারণে পরিস্থিতি ও পরিবেশ বিবেচনা করে সেগুলো ঢেকে রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য মাজহাবের মত: অন্যদিকে শাফেয়ি ও হাম্বলি ফিকহের প্রসিদ্ধ মতসহ একাধিক আলেম পরপুরুষের সামনে নারীর চেহারা ও হাত আবৃত রাখার ওপর মত দিয়েছেন। তাই ‘হাত দেখা গেলেই পর্দা লঙ্ঘন হয়েছে’—এমন কথা সর্বসম্মত বিধান হিসেবে বলা ঠিক নয়।
পা ঢাকার বিধান
নারীর পা ঢাকার বিষয়ে হাদিসে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়। হজরত উম্মে সালামা (রা.) জানতে চেয়েছিলেন, নারীর পোশাকের নিচের অংশ কতটুকু ঝুলিয়ে রাখা যাবে। হাদিসের উদ্ধৃতি—
كَمْ تُرْخِي الْمَرْأَةُ ذَيْلَهَا؟ قَالَ: “تُرْخِينَ شِبْرًا”. قَالَتْ: إِذًا تَنْكَشِفُ أَقْدَامُهُنَّ. قَالَ: فَتُرْخِينَهُ ذِرَاعًا لَا تَزِدْنَ عَلَيْهِ
‘নারী তার পোশাকের নিচের অংশ কতটুকু ঝুলিয়ে রাখবে? তিনি বললেন, ‘এক বিঘত পরিমাণ ঝুলিয়ে রাখবে।’ উম্মে সালামা (রা.) বলেন, ‘এতে তো তাদের পা অনাবৃত হয়ে যেতে পারে।’ তখন তিনি বললেন, ‘তবে এক হাত পরিমাণ ঝুলিয়ে রাখবে, এর বেশি বাড়াবে না।’ (আবু দাউদ ৪১১৭)
এই হাদিসের আলোকে হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত হলো, নারীর পা সতরের অন্তর্ভুক্ত এবং তা ঢেকে রাখা আবশ্যক। তবে হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে পায়ের পাতা নিয়ে একাধিক মতও উল্লেখ রয়েছে।
নামাজ ও পর্দার সতরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
নামাজের সময় নারীর সতরের বিধান এবং পরপুরুষের সামনে পর্দার বিধান এক বিষয় নয়। নামাজের সতর নিয়ে হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে মুখ ও হাতের বিষয়ে যে ব্যতিক্রমের কথা বলা হয়েছে, তা মূলত নামাজ বৈধ হওয়ার শর্তসংক্রান্ত। এটিকে সরাসরি পরপুরুষের সামনে পর্দার বিধান হিসেবে প্রয়োগ করা ঠিক নয়। অর্থাৎ, নামাজে মুখ ও হাত খোলা থাকলে নামাজ সহিহ হওয়ার বিষয়টি আলাদা, আর পরপুরুষের সামনে সেগুলো প্রকাশের বিধান সম্পূর্ণ আরেকটি পৃথক ফিকহি বিষয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, ইসলামে নারীর পর্দা শুধু মাথা ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পোশাকের শালীনতা বজায় রাখা, সৌন্দর্য ও অলংকার পরপুরুষের সামনে প্রকাশ না করা এবং শরীর যথাযথভাবে আবৃত রাখাও এর অন্তর্ভুক্ত। প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, নামাজে চেহারা ও হাতের কব্জি সতরের অন্তর্ভুক্ত না হলেও পা সতরের অন্তর্ভুক্ত। পরপুরুষের সামনে মুখ ও হাত প্রকাশের বিষয়ে ফিকহি মতভেদ রয়েছে এবং ফিতনার আশঙ্কা থাকলে তা ঢেকে রাখার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শরিয়তের এই সুষম বিধান মেনে চলার মাধ্যমেই একজন নারী তার প্রকৃত মর্যাদা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে পারেন।
কিউএনবি/আয়শা/১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ১১:৪০