আলমগীর মানিক, রাঙামাটি : পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও জননিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ (পিসিএনপি)। সংগঠনটির দাবি, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে পার্বত্যাঞ্চলে প্রায় ২৪০টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪৭টি অপহরণ ও ১৬টি হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় ব্যবসায়ী, কৃষক, চালক, শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে রাঙামাটি শহরের বনরূপাস্থ পার্বত্য জ্ঞান অন্বেষণ পাঠাগারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি এ তথ্য তুলে ধরে। পিসিএনপি’র রাঙামাটি জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি)-এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মো. হাবীব আজমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পিসিএনপি’র রাঙামাটি জেলা সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক।
লিখিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পার্বত্যাঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফের কর্মকাণ্ডে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে এবং সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয় মাসে ৭০ জনের বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু-কিশোরকে জোরপূর্বক বিভিন্ন সশস্ত্র কর্মকাণ্ড ও দলীয় কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৪ জন নারী অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রধান অর্থের উৎস হিসেবে চাঁদাবাজি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত এক বছরে ১ হাজার ৫২০টির বেশি চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়। কাঠ ব্যবসায়ী, ওষুধ কোম্পানি, পরিবহন খাত এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা ও মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
ভূমি দখলের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে পিসিএনপি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৪টি ভূমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত ২৭ থেকে ৩০ মে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সদস্যরা প্রায় ২০ একর জমি দখল করে ঘর নির্মাণ করেছে বলে দাবি করা হয়। এছাড়া ২৩ মার্চ বান্দরবানের লামায় ‘জঙ্গল বিলাস’ নামের একটি রিসোর্টে হামলা চালিয়ে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
সংগঠনটি আরও দাবি করে, আন্তর্জাতিক মহলে সহানুভূতি ও অর্থায়ন পাওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়াচ্ছে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক পাচারের মাধ্যমে তরুণদের সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে পিসিএনপি নেতারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়।
ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ, ভূমি বিরোধের ন্যায়সংগত সমাধান এবং সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তারা বলেন, “পার্বত্যাঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও জননিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় সমন্বিত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই সময়।”
সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মোরশেদা আক্তার, পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূর হোসেন, রাঙামাটি জেলা সভাপতি হিরো তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক নূর ইসলাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) রাঙামাটি জেলা সভাপতি তাজুল ইসলাম তাজ এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন। এছাড়া পিসিএনপি, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা পরিষদ, যুব পরিষদ ও ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় এবং জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন নেতাকর্মী সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
কিউএনবি/আয়শা/২৮ জুলাই ২০২৬,/রাত ৮:৪০