সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ০২:১৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম

প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬
  • ২৯ Time View

ডেস্ক নিউজ : প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক চিরন্তন। প্রকৃতি যেমন মানুষের জীবন, জীবিকা ও সভ্যতার ভিত্তি, তেমনি কখনো কখনো সেই প্রকৃতিই ভয়ংকর রূপ ধারণ করে মানুষের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করায়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, পাহাড়ধস, নদীভাঙন কিংবা অতিবৃষ্টি—এসব দুর্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় বহু পুরোনো। কিন্তু প্রতিটি দুর্যোগ আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও তুলে ধরে—সংকটের মুহূর্তে আমরা কতটা মানুষ হয়ে উঠতে পারি?

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা আবারও সেই প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়েছে। পাহাড়ি ঢল, টানা ভারী বর্ষণ এবং নদ-নদীর পানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বহু এলাকা প্লাবিত করেছে।  হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বহু মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু, মাছের ঘের, দোকানপাট ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়েছে। কোথাও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, কোথাও বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, আবার কোথাও বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যাভাব, ওষুধের অভাব এবং শিশুখাদ্যের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। 

শিশু, নারী, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে অসংখ্য গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও বন্য প্রাণীও এই দুর্যোগের নির্মম শিকার হয়েছে। দুর্যোগের মুহূর্তে ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থানের বিভাজন অর্থহীন হয়ে যায়। তখন মানুষের একমাত্র পরিচয়—সে একজন মানুষ। আর সেই কারণেই বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি নৈতিক, মানবিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় দায়িত্ব। সভ্যতার ইতিহাসে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয় তার সম্পদ বা ক্ষমতায় নয়; বরং সংকটকালে অন্য মানুষের জন্য এগিয়ে আসার মানসিকতায়।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, উজানের পানির চাপ, নদ-নদীর নাব্যতা সংকট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পাহাড় কাটা, খাল ও জলাধার দখল এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন আরও বাড়ছে। ফলে বন্যা এখন শুধু মৌসুমি দুর্যোগ নয়; এটি ক্রমেই অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।

বন্যার ক্ষতি কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামো ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কৃষকের একটি মৌসুমের ফসল নষ্ট হলে তার প্রভাব পুরো বছরের আয়ের ওপর পড়ে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান ভেসে গেলে তার বহু বছরের সঞ্চয় মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। দিনমজুর কর্মসংস্থান হারায়, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়, বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়, সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং অসংখ্য পরিবার ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। ফলে একটি বন্যা কেবল কয়েক দিনের দুর্ভোগ নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক অনিশ্চয়তারও সূচনা করে।

এই বাস্তবতায় সরকারের ভূমিকা অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ধার অভিযান, আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা, জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর দ্রুত পুনর্নির্মাণে রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও দক্ষতার পরীক্ষা হয়। কিন্তু এত বড় দুর্যোগে সরকারের একার পক্ষে সব মানুষের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই ব্যক্তি, পরিবার, ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য।

বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করে, জাতীয় সংকটে মানুষের সম্মিলিত শক্তিই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যা, সিডর, আইলা, আম্পান কিংবা সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা অসংখ্য জীবন রক্ষা করেছে। এই মানবিক সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় চরিত্রের অন্যতম উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। এই ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ইসলাম মানুষের দুঃসময়ে সহযোগিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করো।” (সূরা আল-মায়িদা: ২)। 

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট থাকে, আল্লাহও তার প্রয়োজন পূরণ করেন।” এই শিক্ষা শুধু ধর্মীয় নির্দেশনা নয়; এটি একটি মানবিক সমাজ গঠনের মৌলিক ভিত্তি। একইভাবে বিশ্বের অন্যান্য ধর্ম ও মানবিক দর্শনও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে সর্বোচ্চ নৈতিক গুণ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তবে ত্রাণ কার্যক্রম যেন আত্মপ্রচার, রাজনৈতিক প্রদর্শন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়। দুর্যোগে আক্রান্ত মানুষের মর্যাদা রক্ষা করাও মানবিকতার অংশ। প্রকৃত সহায়তা হলো নীরবে, স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে যথাসময়ে সাহায্য পৌঁছে দেওয়া। ত্রাণ বিতরণে ডিজিটাল তালিকা, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ত্রাণের অপচয়, বৈষম্য এবং অনিয়ম বন্ধ করা কঠিন হবে।

ত্রাণের পাশাপাশি পুনর্বাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বীজ, সার ও কৃষিঋণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বল্পসুদে পুনর্বাসন ঋণ, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ বাসস্থান এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর দ্রুত পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। শুধু তা-ই নয়, দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিশু সুরক্ষা এবং নারীদের নিরাপত্তার বিষয়গুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরও বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, পাহাড় কাটা বন্ধ করা, বনায়ন বৃদ্ধি, জলাভূমি সংরক্ষণ, আধুনিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং প্রস্তুতিমূলক ও ঝুঁকি-হ্রাসভিত্তিক নীতি গ্রহণ করতে হবে।

এই বন্যা আমাদের আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে—দুর্যোগ মোকাবিলা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র জাতির দায়িত্ব। আমাদের সবার সামর্থ্য এক নয়, কিন্তু মানবিক দায়িত্ব সবার জন্য সমান। কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ খাদ্য, ওষুধ বা কাপড় দিয়ে, কেউ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে, কেউ উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে, আবার কেউ রক্তদান কিংবা তথ্য ও যোগাযোগ সহায়তার মাধ্যমে অবদান রাখতে পারেন। একটি ছোট সহায়তাও একটি পরিবারের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালাতে পারে।

আজ যারা দুর্গত, আগামীকাল তাদের জায়গায় আমরা বা আমাদের প্রিয়জনও থাকতে পারি। তাই মানবিক সংহতি, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। একটি সভ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়তে হলে বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মূল্যবোধকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সব স্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নয়; বরং সংকটের সময় সেই জাতির মানুষ কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, কতটা মানবিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দেয়—তার মধ্যেই একটি জাতির প্রকৃত মহত্ত্ব নিহিত থাকে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী

 

 

কিউএনবি/আয়শা/১১ জুলাই ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:৩৩

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

July 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit