আলমগীর মানিক, রাঙামাটি : রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় সড়ক মেরামত প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তুলে কাজ বন্ধ রাখতে বলায় উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে গলা চেপে ধরা, শার্টের কলার ধরে ধাক্কা দিয়ে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। সোমবার দুপুরে উপজেলার মাইনী ইউনিয়নের গাঁথাছড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
হেনস্তার শিকার উপ-সহকারী প্রকৌশলী শাহাবুদ্দিন বর্তমানে লংগদু উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ে কর্মরত। তবে অভিযুক্ত ঠিকাদার আলিম উদ্দিন মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, কমিশন ও অতিরিক্ত অর্থ দাবি নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা হয়েছে, এর বাইরে কিছু ঘটেনি। এদিকে, এলজিইডি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ঘটনাস্থলে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চলে আসার পর ঠিকাদার পুনরায় নির্মাণকাজ চালিয়ে যান।
উপজেলা এলজিইডির সার্ভেয়ার নিজাম উদ্দিন জানান, উপজেলা এলজিইডির মেরামত ও সংরক্ষণ (জিওবি) প্রকল্পের আওতায় মাইনীমুখ-ছোট মাহিলা সড়কের ৪৫০ থেকে ১,০৫০ মিটার অংশের মেরামত ও সংরক্ষণ কাজটি বাস্তবায়ন করছে মেসার্স বিনয় এন্টারপ্রাইজ। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ১ কোটি ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭৪১ টাকা এবং চুক্তিমূল্য ৯৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮২ টাকা। ঠিকাদার আলিম উদ্দিন ওই লাইসেন্সের অধীনে কাজটি পরিচালনা করছেন।
তিনি জানান, সোমবার ঢালাই কাজ চলাকালে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সিলেট বালি, অ্যাডমিক্সচার ও ভাইব্রেটর মেশিন ব্যবহার না করার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি পরিদর্শনে গিয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী শাহাবুদ্দিন অনিয়ম দেখতে পেয়ে কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন। নিজাম উদ্দিনের ভাষ্য, এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ঠিকাদার আলিম উদ্দিন প্রথমে শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে তার গলা চেপে ধরেন। পরে লংগদু এলজিইডির কার্য-সহকারী সাদ্দাম হোসেন তাকে ছাড়িয়ে নেন। এরপরও ঠিকাদার আবার শাহাবুদ্দিনের শার্টের কলার ধরে মারতে উদ্যত হন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কার্য-সহকারী সাদ্দাম হোসেন বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমার সামনেই আলিম ভাই শাহাবুদ্দিন স্যারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। শাহাবুদ্দিন স্যার শুধু সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত রেশিও মেনে কাজ করার কথা বলছিলেন। এরপর আলিম আবার এসে তার গলা চেপে ধরেন।”তিনি আরও বলেন, “সিলেট বালি, অ্যাডমিক্সচার ও ভাইব্রেটর মেশিন ব্যবহার না করলে রাস্তার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ভবিষ্যতে সড়ক ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।”
হেনস্তার শিকার উপ-সহকারী প্রকৌশলী শাহাবুদ্দিন বলেন, পরিদর্শনে গিয়ে তিনি দেখেন নির্ধারিত সিলিকা (সিলেট) বালুর পরিবর্তে দেশীয় বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া ভাইব্রেটর মেশিন ব্যবহার করা হয়নি, মিশ্রণে অতিরিক্ত বালু দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কেমিক্যালও ব্যবহার করা হয়নি। তিনি বলেন, “এসব অনিয়মের কারণে আমি কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিই। কিন্তু ঠিকাদার ও তার সহযোগীরা নির্দেশ অমান্য করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আমি বাধা দিলে ঠিকাদার আমার কলার চেপে ধরেন, গলা চেপে ধরেন এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করার কথা বলায় আমার ওপর হামলার মতো আচরণ করা হয়েছে।”
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদার আলিম উদ্দিন। তিনি বলেন, “কোনো মারধরের ঘটনা ঘটেনি। শুধু কথাকাটাকাটি হয়েছে।”তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, “লংগদু উপজেলা এলজিইডিতে ৩ শতাংশ কমিশন এবং অতিরিক্ত ৫ শতাংশ টাকা না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে ঠিকাদারদের হয়রানি করা হয়। এ পর্যন্ত এই কাজের জন্য আমাদের কাছ থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।”তার দাবি, “শাহাবুদ্দিনসহ কর্মকর্তারা সাইটে এলেই প্রতিবার পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়।
এছাড়া হোটেলের খাবারের বিল, বেনসন সিগারেটসহ বিভিন্ন খরচও বহন করতে হয়। এসব দিয়েই কাজ করছি। সোমবারও তিনি শ্রমিকদের সামনে লাথি মেরে নির্মাণসামগ্রী ছুড়ে ফেলেন এবং দুর্ব্যবহার করেন। এ নিয়েই বাকবিতণ্ডা হয়েছে।”এলজিইডি সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাটি উপজেলা প্রশাসন এবং এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে ঠিকাদারের কমিশন ও ঘুষ দাবির অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কিউএনবি/আয়শা/০৭ জুলাই ২০২৬,/রাত ২:১২