বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৭ পূর্বাহ্ন

চার কারণে আমের দামে ধস, ১০০ টাকায় মিলছে ৩ কেজি

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
  • ৯৪ Time View

ডেস্কনিউজঃ রাস্তায় বের হলেই চোখে পড়ে ভ্যানভর্তি আম। ফুটপাত, পাড়া-মহল্লার দোকান থেকে শুরু করে সুপারশপ—সবখানেই এখন আমের ছড়াছড়ি। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ১০০ টাকায় ৩ কেজি আমও বিক্রি হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে আমের কেজি ছিল ৭০ থেকে ১০০ টাকা, তা এখন নেমে এসেছে ৩৫ থেকে ৫০ টাকায়। ফলে ক্রেতারা খুশি হলেও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বাম্পার ফলন, একসঙ্গে বিভিন্ন জাতের আম বাজারে আসা, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সরবরাহ এবং রপ্তানি বাজারের সীমাবদ্ধতা—এই চার কারণে আমের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।

চট্টগ্রাম নগরের কদমতলী ফলমন্ডি, রেয়াজউদ্দিন বাজার, স্টেশন রোডসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে প্রতিদিন ট্রাকভর্তি আম আসছে। প্রতিটি ট্রাকে প্রায় ৫০০ ক্রেট আম থাকে, যেখানে প্রতি ক্রেটে গড়ে ২২ থেকে ২৫ কেজি আম থাকে। প্রতিদিন ৫ থেকে ৭টি ট্রাক আম নিয়ে চট্টগ্রামে প্রবেশ করছে। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকেও প্রতিদিন অন্তত একটি ট্রাক আম আসছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা, নওগাঁ ও দিনাজপুর থেকেও বিপুল পরিমাণ আম সরবরাহ হচ্ছে।

বাজারে এখন হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, বারি-৪, কাটিমন, গোপালভোগসহ প্রায় সব জনপ্রিয় জাতের আম পাওয়া যাচ্ছে।

স্টেশন রোড ফলমন্ডির আল্লাহর দান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবদুল্লাহ জানান, একই জাতের আমও গুণগত মানভেদে ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে হিমসাগর ও ল্যাংড়া আম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় যেমন বিক্রি হচ্ছে আবার একই জাতের আম ৩০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। এটা নির্ভর করে গুণগত মানের ওপর।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রূপালি ও বারি-৪ জাতের আম ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে এসব আমের দাম ৬৫ থেকে ৭০ টাকা হলেও নিম্নমানের বা ছোট আকারের আম ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজিতেও পাওয়া যাচ্ছে।

বাম্পার ফলনের প্রভাব

দাম কমার অন্যতম কারণ বাম্পার ফলন। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ মৌসুমে দুই লাখ ৫ হাজার ২০৫ হেক্টর বাগান থেকে আম উৎপাদিত হয় ২৬ লাখ ৬২ হাজার ৫৮৩ টন। চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯৮ টন।

চাষিরা জানান, গত বছর এ সময়ে ক্ষীরশাপাতি আমের দাম ছিল মণপ্রতি ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়। ল্যাংড়া আমের দামও নেমে এসেছে মণপ্রতি ১ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। এদিকে পর্যাপ্ত দাম না পাওয়ায় হতাশ চাষিরা। তাদের মতে, পর্যাপ্ত আম সরবরাহ থাকলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বেপারী বাজারে আসেনি।

খাগড়াছড়ির বাগান ব্যবসায়ী মো. ফোরকান বলেন, ‘ এ বছর আমের দাম খুব কম। এক ক্রেট আম (২২ কেজি) মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করছি। গত বছর নিম্নমানের আমও ১ হাজার টাকার নিচে বিক্রি করতে হয়নি।’

একসঙ্গে বাজারে সব জাতের আম

দাম কমার দ্বিতীয় কারণ হলো বিভিন্ন জাতের আম একসঙ্গে বাজারে চলে আসা। সাধারণত বিভিন্ন জাতের আম ধাপে ধাপে বাজারে এলেও এবার জুনের শুরুতেই গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, বারি-৪সহ বিভিন্ন জাত পেকে গেছে।

চাষিরা জানান, গাছে পাকা আম বেশি দিন ধরে রাখা সম্ভব না হওয়ায় দ্রুত সংগ্রহ ও বিক্রি করতে হয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহের চাপ বেড়ে গেছে।

চাহিদার চেয়ে বেশি সরবরাহ

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে আমের সরবরাহ যেভাবে বেড়েছে, সে তুলনায় ক্রেতা বাড়েনি। ফলে দ্রুত বিক্রির জন্য দাম কমাতে বাধ্য হচ্ছেন বিক্রেতারা।

চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, ‘মৌসুম এখনো শুরুর দিকে। অথচ দেশের প্রায় সব জনপ্রিয় জাতের আম বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দাম কিছুটা কমেছে। জুলাইয়ে নতুন জাতের আম আসলে বাজার পরিস্থিতি আবার পরিবর্তন হতে পারে।’

রপ্তানি বাজারে সীমাবদ্ধতা

দাম কমার আরেকটি বড় কারণ রপ্তানি বাজারের সীমাবদ্ধতা। দেশে উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানি এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়, প্যাকেজিং খরচ এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে বিপুল পরিমাণ আম দেশীয় বাজারেই থেকে যাচ্ছে।

রপ্তানিকারকদের মতে, বাগান থেকে আম সংগ্রহ, বাছাই ও প্যাকেজিং মিলিয়ে কেজিপ্রতি প্রায় ১৫০ টাকা খরচ হয়। এরপর আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় যোগ হলে বাংলাদেশের আম প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি দামে পড়ে।

আম উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম হলেও রপ্তানি তলানিতে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬-১৭ মৌসুমে আম রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩০৯ টন। এর পাঁচ বছর পর আম রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে হয় ১ হাজার ৭৬৭ টন। ২০২২-২৩ মৌসুমে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ১০০ টন আম যায় বিদেশে। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আম রপ্তানি কমে হয় ১ হাজার ৩২১ টন। ২০২৪-২৫ মৌসুমে আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ৫ হাজার মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হলেও রপ্তানি হয় ২ হাজার ১২১ টন। বর্তমানে বিশ্বের ৩৮টি দেশে বাংলাদেশের আম যাচ্ছে, যার মধ্যে ইউরোপের দেশগুলো ছাড়াও নতুন করে জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে।

কৃষি বিভাগের হিসাবে, বাংলাদেশের আমের বাজার ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। রপ্তানি সহজ হলে এ বাজার ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ক্রেতাদের স্বস্তি

দাম কমে যাওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে। অনেকেই বলছেন, কয়েক বছর পর এবার পরিবারের সবাইকে নিয়ে মন ভরে আম খাওয়া যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম নগরের সৈয়দ শাহ রোড এলাকায় ভ্যানে আম বিক্রি করা তসলিম মিয়া বলেন, ‘এখানকার বেশিরভাগ মানুষ শ্রমজীবী। দাম কম থাকায় মানুষ বেশি করে আম কিনছে। গত দুই দিনেই এই এলাকায় প্রায় ৭৫টি ভ্যান আম নিয়ে এসেছে।’

কিউএনবি/বিপুল/১০.০৬.২০২৬/রাত ১০.৫৩

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit