স্পোর্টস ডেস্ক : ফুটবল বিশ্বকাপ দীর্ঘদিন ধরেই সারাবিশ্বে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও জনপ্রিয় আসর হিসেবে বিবেচিত। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হওয়া এই প্রতিযোগিতার অন্যতম আকর্ষণ ছিল সীমিত সংখ্যক দলের খেলার যোগ্যতা অর্জন, কঠিন বাছাইপর্ব এবং প্রতিটি ম্যাচই উত্তেজনা ও প্রতিযোগীতা। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করায় বিশ্বকাপ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্বকাপ কি তাহলে তার পুরোনো ঐতিহ্য ও আবেদন হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে?
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপে ম্যাচের সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ। যেখানে গতবারের ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ম্যাচ ছিল ৬৪টি, সেখানে এবার প্রায় ৪০টি ম্যাচ বেশি অনুষ্ঠিত হবে।
ফিফা বলছে, এই বৃদ্ধি বিশ্বে ফুটবল বিস্তারে ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর ফলে আফ্রিকা, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের আরও বেশি দেশ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো দেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে, যা অবশ্যই বিশ্ব ফুটবলের বিস্তারে ইতিবাচক।
তবে ক্রীড়া বিপণন ও ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছে, অতিরিক্ত দেশের অংশগ্রহণ বিশ্বকাপের মৌলিক আকর্ষণকে ম্লান করে দিতে পারে। তাদের যুক্তি, বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন সবসময়ই ছিল একটি বড় অর্জন। কিন্তু দলসংখ্যা বাড়ার ফলে বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করাকে আগের মতো বড় অর্জন হিসেবে দেখা নাও হতে পারে। একইসঙ্গে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি ম্যাচ তুলনামূলক গুরুত্ব পাবে না। অতীতে গ্রুপপর্বের একটি ম্যাচের ফলই অনেক সময় পুরো আসরের ভাগ্য নির্ধারণ করত। কিন্তু বড় টুর্নামেন্টে একটি ম্যাচের ফলাফল তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল প্রতিটি দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা। চার বছর অপেক্ষার পর সীমিত সংখ্যক দেশের অংশগ্রহণে বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ ছিল উত্তেজনাপূর্ণ ও প্রতিযোগীতার আসর। কিন্তু দল ও ম্যাচ বাড়তে থাকলে সেই আকর্ষণ কমে যেতে পারে।
আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তিনটি দেশে যৌথভাবে আয়োজন। ভিন্ন অবকাঠামো, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, পরিবহন ও আয়োজক লক্ষ্য থাকায় পুরো আসরকে একটি একক অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করা কঠিন হতে পারে। যদিও অতীতেও যৌথ আয়োজনে সফল টুর্নামেন্ট হয়েছে, তবু এত বড় পরিসরের বিশ্বকাপ পরিচালনা একটি বড় পরীক্ষা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় ক্লাব প্রতিযোগিতা, মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপ সব ক্ষেত্রেই দলসংখ্যা ও ম্যাচ বাড়ানো হয়েছে। ফলে ফুটবল ক্যালেন্ডার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ব্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপও যদি ক্রমাগত বড় হতে থাকে, তাহলে এটি একটি বিশেষ বৈশ্বিক আয়োজনের বদলে বছরজুড়ে চলা অসংখ্য প্রতিযোগিতার আরেকটি অংশ হিসেবে পরিণত হতে পারে।
তবে এসব উদ্বেগের মধ্যেও বিশ্বকাপ যে এখনও ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ও আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতা, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে আরও বাড়ানোর পথে হাঁটলে এই টুর্নামেন্ট তার ঐতিহ্য, একচ্ছত্র আবেদন এবং বৈশ্বিক আবেগ ধরে রাখতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই প্রশ্নের প্রথম বড় পরীক্ষামঞ্চ হতে যাচ্ছে। নতুন দেশগুলোর অংশগ্রহণ যেমন বিশ্ব ফুটবলের বিস্তার ঘটাবে, তেমনি এই বৃদ্ধি বিশ্বকাপের স্বকীয়তা বজায় রাখতে কতটা সফল হয়, সেদিকেও থাকবে ফুটবল বিশ্বের নজর।
তথ্যসূত্র: মিরাজ নিউজ
কিউএনবি/অনিমা/০৫.০৬.২০২৬/রাত ১০:৩৪