রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩০ অপরাহ্ন

শুল্কের অস্ত্রে কানাডাকে কোণঠাসা করতে ট্রাম্পের নতুন চাল

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৬৪ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে গোটা বিশ্বের ওপর ছড়ি ঘোরাতে সকল অস্ত্র নিয়ে মাঠে নেমেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলা থেকে তাদের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ‍তুলে এনে, ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সাথে যুদ্ধ বাঁধিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক সক্ষমতার বাস্তব প্রমাণ দিয়েছে। যদিও ইরানে দীর্ঘমেয়াদী ‍যুদ্ধ আমেরিকানরা পছন্দ করছে না। তবে সামরিক অস্ত্রের বাইরেও ট্রাম্পের আরেকটি প্রিয় অস্ত্র আছে, আর সেটি হলো শুল্ক।

গতবছর যুক্তরাষ্ট্র সব বাণিজ্য সহযোগী দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে বিশ্বজুড়ে তুলকালাম বাধিয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সেই শুল্ক বাতিল করে দিয়ে ট্রাম্পকে এই শুল্ক আগ্রাসন থেকে নিবৃত করেন। তারপরও থেমে যাননি ট্রাম্প। ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ধারা ১২২-এর অধীনে সাময়িকভাবে ঢালাও ১০ ভাগ শুল্ক আরোপ করেছিলেন তিনি, যার মেয়াদ এই সপ্তাহে শেষ হতে চলেছে।

বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞার বাইরে অস্ত্র হিসেবে শুল্ক ট্রাম্পের খুবই প্রিয়। নিজেদের বিশাল বাজারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশকে শায়েস্তা করতে কথায় কথায় শুল্ক আরোপের হুমকি দেন ট্রাম্প। ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনলে বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়।

গত সপ্তাহে, ব্রাজিলের বাণিজ্য নীতিকে অন্যায্য দাবি করে বাণিজ্য আইনের ধারা ৩০১-এর অধীনে ব্রাজিলের অনেক পণ্যের ওপর ২৫ ভাগ নতুন শুল্ক ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অস্ত্র হিসেবে শুল্ক ট্রাম্পের এতই প্রিয়, গত সপ্তাহে কানাডায় দাবানলের কারণে উড়ে আসা ধোঁয়ায় পরিবেশের ক্ষতি পোষাতে কানাডার ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।

দাবানল ট্যাক্স আরোপ না করলেও হুমকির তিনদিনের মাথায় সোমবার কানাডার কিছু পণ্যের ওপর ৫০ ভাগ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই শুল্ক কার্যকর হবে এবং এর আওতায় প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্য পড়বে।

মেক্সিকো, কানাডার সাথে যৌথভাবে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করলেও এ দুই প্রতিবেশীর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো নয়। মেক্সিকোর সাথে সম্পর্ক আগে থেকেই খারাপ। কানাডা আমেরিকার বন্ধু প্রতিবেশীই ছিল। তবে ট্রাম্প কানাডার সাথে রীতিমত পায়ে পারা দিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে সম্পর্ক খারাপ করছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে কানাডাকে আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। 

ক্ষমতায় না হলেও আয়তনে বড় কানাডার রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষ ট্রাম্পের এ আহবানে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তারা এটিকে কানাডার সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করেন। দাবানলের বিপদে পাশে না দাড়িয়ে উল্টো শুল্ক আরোপের হুমকিও সাধারণ মানুষকে মর্মাহত করেছে।

সর্বশেষ কানাডার কিছু পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ ভাগ শুল্ক আরোপকে বিবেচনা করা হচ্ছে সরাসরি শত্রুতার ঘোষণা হিসেবে। চীন ছাড়া আর কোনো দেশের পণ্যের ওপরই যুক্তরাষ্ট্রের এত উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করার নজির নেই। 

গতবছর বিশ্বজুড়ে পাল্টা শুল্ক আরোপের পর অধিকাংশ দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার টেবিলে বিষয়টি সমঝোতার চেষ্টা করেছে। কেবল কানাডা আর চীনই পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল। পাল্টা শুল্ক আরোপ করেই বসে থাকেনি কানাডা। তারা চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলে। বিষয়টি ভোলেননি ট্রাম্প। তাই তো কানাডাকে শায়েস্তা করতে প্রায় শত বছরের পুরোনো একটি আইন খুঁজে বের করেছেন তিনি। ১৯৩০ সালের ট্যারিফ অ্যাক্টের ৩৩৮ ধারা অনুযায়ী কানাডার পণ্যে ৫০ ভাগ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যদিও এ আইনের ব্যবহার বিরল।

যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি, ডেইরি পণ্য ও অ্যালকোহলের ক্ষেত্রে কানাডা বৈষম্যমূলক আচরণ করছে, এমন অভিযোগ তুলে  ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।  যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কানাডার শুল্ক নিয়ে টানাপড়েনটা পুরোনো। ট্রাম্পের নানা বক্তব্য আর গতবছর পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের ঘটনা দু’দেশের সম্পর্ককে তলানিতে নিয়ে গেছে।

পাল্টা হিসেবে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ির ওপর বাড়তি শুল্ক তো আরোপ করেছেই, পাশাপাশি চীন থেকে গাড়ি আমদানি বাড়িয়েছে। বাড়তি শুল্কের কারণে কানাডায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেইরি পণ্য ও অ্যালকোহলের বাজার ছোট হয়ে গেছে। কানাডায় দুধের আমদানি নির্ধারিত সীমা ছাড়ালে ৩০০ শতাংশের বেশি শুল্ক দিতে হয়। 

গতবছর থেকে কানাডার অধিকাংশ প্রদেশে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের মদ বর্জন করা হচ্ছে। বাড়তি শুল্কের কারণে কানাডায় মার্কিন গাড়ি রপ্তানি ২২ ভাগ এবং অ্যালকোহল রপ্তানি ৮১ ভাগ কমে গেছে। ডেইরি পণ্যের বাজারেও ধ্বস নেমেছে। এর প্রতিশোধ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র ৫০ ভাগ বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিল।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইউএসএমসিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কানাডা ও মেক্সিকো চুক্তিটি নবায়নের পক্ষে থাকলেও ট্রাম্প প্রশাসনের এখন আর সেই চুক্তি নিয়ে আগ্রহ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ইউএসএমসিএ চক্তি সংশোধন করতে চায়। 

নতুন আরোপিত শুল্কের ব্যাপারে ট্রাম্প এতটাই কড়া যে, ইউএসএমসিএ চুক্তির আওতায় থাকা পণ্যকেও এ শুল্ক দিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ‘ইউএসএমসিএর সরাসরি লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র যে একতরফা পদক্ষেপগুলো নিয়ে আসছে, এটি তার সর্বশেষ উদাহরণ।’

গত রবিবার নিউজার্সিতে বিশ্বকাপ ফাইনালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথা হয়েছে। কিন্তু তার পরদিনই আসলো ৫০ ভাগ শুল্কের বিশাল বোঝা। তবে মার্ক কার্নি বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা আরও জোরদার করতে তারা প্রস্তুত।

মার্ক কার্নি বলেন, তার দেশ মুক্ত এবং ন্যায্য বাণিজ্যের সুফলে বিশ্বাসী।

কার্নি আরও বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতেই কানাডা অবিরাম কাজ করে যাবে এবং দেশের শক্তি বাড়াতে ও কানাডার শ্রমিক, কৃষক, ব্যবসায়ী ও পরিবারগুলোকে সহায়তা করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।

তবে অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড মার্ক কার্নির মত অত কৌশলী নন। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি এক্স (সাবেক টুইটার)এ দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, যদি এই শুল্ক কার্যকর করা হয়, তবে কানাডার উচিত হবে শুল্কের বদলে শুল্ক এবং ডলারের বদলে ডলার হিসেবেই এর জবাব দেওয়া।

কিউএনবি/অনিমা/২১ জুলাই ২০২৬,/রাত ১১:৪৩

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit