রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৬ পূর্বাহ্ন

পানামায় যেভাবে পৌঁছেছে ইসলাম

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৮ Time View

ডেস্ক নিউজ : উত্তর আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণাংশে অবস্থিত স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র পানামা। দেশটি ১৮২১ সালে স্পেন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং পরে ১৯০৩ সালে কলম্বিয়া থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

পানামার রাজধানী পানামা সিটি। পানামার আয়তন ৭৫,৪১৭ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশটির জনসংখ্যা ৪৩,৩৭,৭৬৮ জন। জনসংখ্যার ৯১.৫ শতাংশ খ্রিস্টান, ৭.৬ শতাংশ মানুষের কোনো ধর্ম নেই।

বাকিরা মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্মের অনুসারী। পিউ সেন্টারের এক হিসাব মতে, পানামায় মুসলিম অধিবাসীর সংখ্যা ২৪ হাজার, যা দেশটির জনসংখ্যার মাত্র ০.৭ শতাংশ।  
পানামায় ইসলামের আগমন

এখন থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগের কথা। ১৫৫২ সাল।

পানামায় মুসলমানদের প্রথম দলটি আসে আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাস হয়ে। তারা মান্দিঙ্কা ক্রীতদাস হিসেবে পরিচিতি ছিল। পর্তুগিজরা স্বর্ণের খনিতে কাজের জন্য এসব দাসকে পানামায় নিয়ে আসে। তারা প্রধানত সর্বপ্রাণবাদী এবং মুসলিম ছিল। তখন প্রায় ৫০০ জনের একটি দল পানামার আটলান্টিক উপকূলে পৌঁছায়।

আটলান্টিকের উত্তল উর্মিমালার তীব্রতা অতিক্রম করে তারা ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। এসব অভিবাসী লোকেরা ছিল বুদ্ধিমান, পরিশ্রমী এবং উচ্চ সংস্কৃতির মানুষ। এই দলের নেতা ছিলেন বায়ানো। এসব মুসলিম দাস পানামার প্রথম মুসলিম হিসেবে পরিচিত।
পানামায় ইসলামের বিকাশ ও বিস্তার

১৯২৯ সালে আরেক মুসলিম ব্যবসায়ী দল ভারতের বোম্বে থেকে পানামায় পাড়ি জমায়। তাদের মধ্যে ছিলেন মুহাম্মদ ইবরাহিম, সলোমন বাকু, আসভাত পরিবারের ইসলাইল, মুসা, বাহনা পরিবারসহ অন্যান্য মুসলিম সদস্য। তাঁরা মিলে ‘সুন্নি ইন্দো-পাকিস্তান মুসলিম সোসাইটি’ নামের একটি মুসলিম সংগঠন গড়ে তোলেন। তাঁদের অনেকেই কোলন সিটির একটি বিল্ডিংয়ে বাস করতেন এবং সেখানেই নামাজ পড়তেন।

১৯২৯ থেকে ১৯৪৮ সময়কালে সুন্নি ইন্দো-পাকিস্তান মুসলিম সোসাইটি সংগঠনের সহায়তায় একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর জায়গাটি দান করেন ব্যবসায়ী আলি আকবর। এটিই সম্ভবত পানামা সিটিতে নির্মিত প্রথম মসজিদ। তবে এই মসজিদের অর্ধেক কাজ সমাপ্ত হয়। এখানে ঈদের নামাজ এবং অন্য নও-মুসলিমদের শিক্ষার কাজ পরিচালিত হতো। এই সময়ে নও-মুসলিমের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫ জন। এসব মুসলমান ছিলেন কালো এবং তারা জ্যামাইকা, ত্রিনিদাদ ও বারবাডোজের অধিবাসী ছিলেন। মুসলিম ভাই আলি আকবর এসব নও-মুসলিমের শিক্ষা ক্লাস পরিচালনা করতেন। বর্তমানে এই স্থানটি আর প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না; বরং এখানে স্থানীয় সরকার গৃহহীন মানুষদের বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন।

১৯২৯ থেকে ১৯৪৮ সময়কালে মুসলমানদের অন্য একটি দল কোলন সিটিতে ইসলাম চর্চা করত। জ্যামাইকার এক ভাই বাসিল উসকান এই দলটি পরিচালনা করতেন। তিনি একটি জায়গা ভাড়া নেন এবং সেখানে নামাজ আদায় ও বিভিন্ন মিটিংয়ের ব্যবস্থা করেন। ১৯৩২ সালে অন্য একটি মুসলিম দল পানামা সিটির কালিডোনিয়ার সান মিগুয়েল বাস করত। তারাও সেখানে নামাজ এবং বিভিন্ন মিটিং করার ব্যবস্থা করেন। ইন্দো-পাকিস্তান থেকে আসা মুসলমান, যাঁরা পানামা সিটিতে বাস করতেন, তাঁদের স্ত্রীদের আগমনের পর ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তাঁদের কোনো পারিবারিক কাঠামো ছিল না। তখন মুসলমানরা ভাড়া বাড়িতে নামাজ পড়তেন। এই বাড়িটি ছিল তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি। তখন একজন মুসলিম ভাই সালিবা কোরআনের ইংরেজি অনুবাদ করেন এবং তাঁর মাধ্যমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নও-মুসলিমদের কোরআন ও ইসলাম শিক্ষা দিতেন। এর কারণ ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের লোকেরা ইংরেজিতে পারদর্শী ছিল।

১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সালের সময়কালে মুসলমানরা দুটি এলাকা—কোলন এবং ক্যালেতে নামাজ ও ইবাদত বন্দেগি করতেন। ১৯৬৩ সালে মুসলমানরা ‘জারদান ডি পাজ’ এলাকায় কবরস্থানের জন্য একটি জমি ক্রয় করেন। এদিকে ভারত-পাকিস্তান বংশোদ্ভূত মুসলিমরা ১৯৯১ সালে আরবাইজান নামক স্থানে একটি সম্পত্তি ক্রয় করেন। এটিকে তাঁরা একটি কবরস্থান হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর আগে ১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে পানামার স্থানীয়রা ‘পানামা অ্যাসোসিয়েশন অব ইসলাম’ নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবদুল ওয়াহাব জনসন এবং সুলেমান জনসনের নেতৃত্বে পানামা সিটি এবং কোলনে ইসলাম প্রচার শুরু করেন।

ড. আবদুল খাবির মুহাম্মদ ছিলেন একজন ইসলামী পণ্ডিত ব্যক্তি। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের পর পানামার মুসলমানরা ইসলাম সম্পর্কে অধ্যয়ন শুরু করেন। এদিকে ইন্দো-পাকিস্তানি মুসলিমরা ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত একটি কক্ষে তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা দিতে থাকেন। ১৯৭৮ সালে তাঁরা পানামা সিটির পেরেজিল এলাকায় একটি জায়গা নিয়ে সন্তানদের শিক্ষার কাজে ব্যবহার করতে শুরু করেন। এদিকে ১৯৮২ সালে মুসলমানরা ‘এল সেন্ট্রো কালচারাল ইসলামিকো দ্য কোলন’ নামের একটি ইসলামিক কেন্দ্র ও মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদ ও কেন্দ্রটি লিবিয়াভিত্তিক ‘ইসলামিক কল সোসাইটি’ এবং ভারতের একজন স্থানীয় বণিক সলোমন ভিখু কর্তৃক যৌথভাবে নির্মিত হয়। এটি উদ্বোধনের পর ড. আবদুল খাবির মুহাম্মদ এখানে আগ্রহী ব্যক্তিদের সন্ধ্যায় এবং প্রতি রবিবারে ইসলামী জ্ঞানের শিক্ষা দিতেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে নও-মুসলিম হামজা বিয়ার্ড ক্লাস নিতেন।

এভাবে মুসলমানদের অনেক চেষ্টা ও লড়াইয়ের মাধ্যমে খ্রিস্টানপ্রধান পানামায় ইসলামের কাজ এগিয়ে চলে।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং সিনিয়র ইসলামী ব্যাংকার

কিউএনবি/অনিমা/২৫ অক্টোবর ২০২৬,/সকাল ৭:২৬

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit