ডেস্ক নিউজ : রমজান শুধু রোজা রাখার মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও হৃদয়ের চিকিৎসার শ্রেষ্ঠ সময়। সারা বছরের গুনাহ, গাফেলতি ও দুনিয়ার ব্যস্ততায় মানুষের অন্তর কঠিন হয়ে যায়। রমজান সেই অন্তরকে কোমল করার, আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এবং ইমানকে নবায়ন করার এক অনন্য সুযোগ। আল্লাহ তাআলা এই মাসে কুরআন নাজিল করেছেন, শয়তানকে বন্দি করা হয় এবং বান্দার জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়। তাই আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য এ সময়টিই সবচেয়ে উপযোগী।
প্রখ্যাত আলেম ইয়াহিয়া ইবন মুয়াজ (রহ.) বলেছেন— কুরআন তিলাওয়াত, কম খাওয়া, কিয়ামুল লাইল করা, সেহরির সময় দোয়া করা এবং নেককারদের সঙ্গ—এই পাঁচটি বিষয়ই রমজানের প্রধান ফোকাস হওয়া উচিত। এগুলোই অন্তরের প্রকৃত মহৌষধ।
নিচে এই পাঁচটি আমলের গুরুত্ব কুরআন ও হাদিসের আলোকে তুলে ধরা হলো—
১. কুরআন বুঝে পড়া
রমজান মাস মূলত কুরআনের মাস। মানবজাতির হেদায়েতের জন্য এই মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে। তাই শুধু তিলাওয়াত নয়, বুঝে পড়া এবং নিজেদের জীবনে তা বাস্তবায়ন করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন—
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ
‘রমজান মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে—মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্য-মিথ্যার স্পষ্ট প্রমাণস্বরূপ।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৫)
আরও বলা হয়েছে—
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ
‘তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না?’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৮২)
২. কম আহার করা
কম খাওয়া আত্মসংযম শেখায় এবং ইবাদতে মনোযোগ বাড়ায়। অতিরিক্ত আহার মানুষের অন্তরকে কঠিন করে এবং অলসতা সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ، بِحَسْبِ ابْنِ آدَمَ أُكُلَاتٌ يُقِمْنَ صُلْبَهُ
‘মানুষ পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করেনি। মানুষের জন্য এতটুকু খাদ্যই যথেষ্ট, যা তার দেহকে সচল রাখে।’ (তিরমিজি ২৩৮০)
রমজানের উদ্দেশ্যই হলো তাকওয়া অর্জন, আর সংযম ছাড়া তাকওয়া অর্জন সম্ভব নয়।
৩. কিয়ামুল লাইল করা
রাতের ইবাদত মানুষের অন্তরকে জীবিত করে। রমজানের তারাবিহ ও তাহাজ্জুদ বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
‘যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে ইবাদত করে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি ২০০৯, মুসলিম ৭৬০)
আল্লাহ তাআলা বলেন—
كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ
‘তারা রাতে অল্প সময়ই নিদ্রা যেত।’ (সুরা আয-যারিয়াত: আয়াত ১৭)
৪. শেষ রাতে আল্লাহর কাছে দোয়া করা
সেহরির সময় আল্লাহর রহমত বিশেষভাবে নাজিল হয়। এটি দোয়া ও ইস্তেগফারের সবচেয়ে উত্তম সময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ فَيَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ
‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের প্রতিপালক দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন—কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব?’ (বুখারি ১১৪৫, মুসলিম ৭৫৮)
আল্লাহ তাআলা নেককারদের সম্পর্কে বলেন—
وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
‘আর তারা শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (সুরা আয-যারিয়াত: আয়াত ১৮)
৫. দ্বীনি সহচার্য লাভ করা
নেককারদের সঙ্গ মানুষের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং অন্তরকে আল্লাহমুখী করে তোলে। ভালো মানুষের সঙ্গ মানুষকে ভালো পথে পরিচালিত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে। তাই তোমরা দেখো কাকে বন্ধু বানাচ্ছ।’ (আবু দাউদ ৪৮৩৩, তিরমিজি ২৩৭৮)
আর আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ
‘তুমি নিজেকে তাদের সঙ্গেই রাখো, যারা সকাল-সন্ধ্যা তাদের প্রতিপালককে ডাকে।’ (সুরা আল-কাহফ: আয়াত ২৮)
রমজান একটি সীমিত সময়ের নিয়ামত, কিন্তু এর প্রভাব হতে পারে আজীবন। এই মাসে কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, কম খাওয়া, রাত জেগে ইবাদত করা, শেষ রাতে দোয়া করা এবং নেককারদের সঙ্গ গ্রহণ— এই পাঁচটি আমল মানুষের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথ খুলে দেয়।
যদি আমরা এই রমজানে অন্তরের চিকিৎসা করতে পারি, তাহলে আমাদের জীবন বদলে যেতে পারে। কারণ সুস্থ হৃদয়ই হলো সফলতার মূল চাবিকাঠি— দুনিয়াতেও, আখিরাতেও।
কিউএনবি/আয়শা/০১ মার্চ ২০২৬,/রাত ১০:২০