ডেস্ক নিউজ : মানুষের জীবনে দাম্পত্য সম্পর্ক শুধু দুনিয়ার প্রয়োজন মেটানোর বন্ধন নয়; বরং এটি ইমান, ত্যাগ ও পারস্পরিক দায়িত্বের এক পবিত্র আমানত। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— এই সম্পর্ক কি দুনিয়ার সীমানা পেরিয়ে আখিরাত পর্যন্ত বিস্তৃত? স্বামী–স্ত্রীর এই পার্থিব সঙ্গ কি জান্নাতেও অটুট থাকবে? কুরআন ও সুন্নাহ এই প্রশ্নের এমন এক সান্ত্বনাদায়ক উত্তর দেয়, যা মুমিন হৃদয়কে আশায় ভরিয়ে তোলে।
اُدۡخُلُوا الۡجَنَّۃَ اَنۡتُمۡ وَ اَزۡوَاجُكُمۡ تُحۡبَرُوۡنَ
‘তোমরা সস্ত্রীক সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ করো।’ (সুরা যুখরুফ: আয়াত ৭০)
আয়াতের তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা জান্নাতিদের এমন এক সৌভাগ্যের সংবাদ দিচ্ছেন, যেখানে শুধু ব্যক্তিগত মুক্তিই নয়— বরং পরিবারসহ, জীবনসঙ্গীসহ চিরস্থায়ী সুখের জীবন নিশ্চিত করা হয়েছে।
> أَنْتُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ — তোমরা ও তোমাদের স্ত্রীগণ
এটি প্রমাণ করে যে, ঈমান ও আমলে সঙ্গী হলে স্বামী–স্ত্রী আখিরাতেও একসঙ্গে থাকবে। ইসলাম দাম্পত্য সম্পর্ককে কেবল দুনিয়ার চুক্তি নয়, বরং আখিরাত পর্যন্ত বিস্তৃত এক পবিত্র বন্ধন হিসেবে দেখে।
> تُحْبَرُونَ— অত্যন্ত আনন্দিত, সম্মানিত ও আপ্যায়িত
আরবি ‘হাবর’ শব্দ থেকে এসেছে—যার অর্থ এমন আনন্দ, যা বাহ্যিক সৌন্দর্য, অন্তরের প্রশান্তি ও সম্মানের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ হবে সম্মানের সঙ্গে, আনন্দের সঙ্গে, কোনো ভয় বা দুঃখ ছাড়া।
কুরআনের অন্য আয়াতে পরিবারসহ জান্নাতের সুসংবাদ
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দেন—
جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ
‘তারা চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করবে— তাদের পিতা-মাতা, স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল হবে তারাও (তাদের সঙ্গে থাকবে)।’ (সুরা রাদ: আয়াত ২৩)
এ আয়াত প্রমাণ করে যে, জান্নাত কেবল একক অর্জন নয়; বরং পরিবারভিত্তিক পুরস্কার।
হাদিসের আলোকে জান্নাতে দাম্পত্য জীবন
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا دَخَلَ الْجَنَّةَ أُسْكِنَ هُوَ وَزَوْجُهُ قَصْرًا مِنَ اللُّؤْلُؤِ
‘মুমিন যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাকে ও তার স্ত্রীকে মুক্তার তৈরি প্রাসাদে বসবাস করানো হবে।’ (তিরমিজি ২৫২২)
ইসলামে দাম্পত্য জীবনের লক্ষ্য: জান্নাত
দুনিয়াতে স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্ক যদি হয়—
> ঈমানভিত্তিক
> ধৈর্য ও দায়িত্বপূর্ণ
> আল্লাহভীরুতা ও পারস্পরিক সহযোগিতায় গড়া
তবে সেই সম্পর্কের পরিণতি হবে— ‘তোমরা সস্ত্রীক সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ করো’।
আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়
> জান্নাতে একা যেতে নয়, পরিবারকে সঙ্গে নিতে প্রস্তুতি নিতে হবে
> দাম্পত্য জীবন শুধু সুখ–দুঃখের নয়, বরং আখিরাতের পথচলার সঙ্গী
> স্বামী–স্ত্রী একে অপরকে জান্নাতের দিকে এগিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব বহন করে
এই আয়াত আমাদের সামনে ইসলামের এক অপূর্ব সৌন্দর্য তুলে ধরে—যেখানে জান্নাত শুধু ব্যক্তিগত মুক্তির স্থান নয়, বরং পরিবারসহ সম্মানিত ও আনন্দঘন আবাসস্থল। দুনিয়ায় যারা আল্লাহর জন্য সম্পর্ক রক্ষা করে, ত্যাগ স্বীকার করে এবং ঈমানের পথে একসঙ্গে চলে—আখিরাতে আল্লাহ তাদের বলবেন—
اُدۡخُلُوا الۡجَنَّۃَ اَنۡتُمۡ وَ اَزۡوَاجُكُمۡ تُحۡبَرُوۡنَ
‘উদখুলুল জান্নাতা আন্তুম ওয়া আজওয়াঝুকুম তুহবারূন’
তোমরা সস্ত্রীক সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ করো।
ইসলাম আমাদের জানিয়ে দেয়—আখিরাতের জান্নাত কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতীক নয়; বরং এটি পরিবারসহ সম্মানিত ও আনন্দঘন পুরস্কারের স্থান। দুনিয়ায় যারা ইমানের পথে একসঙ্গে চলেছে, সুখ–দুঃখে আল্লাহকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক রক্ষা করেছে, তাদের জন্য জান্নাতে রয়েছে পুনর্মিলনের সৌভাগ্য। সুতরাং দাম্পত্য জীবন হোক জান্নাতমুখী পথচলার সঙ্গী—যাতে আখিরাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই পরম আহ্বান শোনা যায়— ‘তোমরা সস্ত্রীক সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ করো।’
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।
কিউএনবি/আয়শা/০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/রাত ৮:১২