ডেস্ক নিউজ : নামাজ মুমিনের জন্য আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের সর্বোত্তম ইবাদত। কিন্তু এই ইবাদতকে ব্যাহত করার জন্য শয়তান নানাভাবে চেষ্টা করে। নামাজের সময় রাকাত, রুকু, সিজদা বা ওজু নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করাও তার অন্যতম কৌশল। ইসলাম এ বিষয়ে আমাদের অজ্ঞাত রাখেনি; বরং কুরআন ও হাদিসে স্পষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং সহজ সমাধান দিয়েছে— যাতে বান্দা প্রশান্ত চিত্তে নামাজ আদায় করতে পারে।
ওয়াসওয়াসা দেওয়া শয়তানের পরিচয় হলো ‘খানযাব’ শয়তান। হাদিসে পাকে এসেছে—
হযরত উসমান ইবনু আবিল আস (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর কাছে আরজ করলাম—
يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ حَالَ بَيْنِي وَبَيْنَ صَلَاتِي وَقِرَاءَتِي يُلَبِّسُهَا عَلَيَّ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ذَاكَ شَيْطَانٌ يُقَالُ لَهُ خِنْزَبُ، فَإِذَا أَحْسَسْتَهُ فَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنْهُ وَاتْفُلْ عَنْ يَسَارِكَ ثَلَاثًا.
‘হে আল্লাহর রাসূল! শয়তান আমার ও আমার নামাজ ও কিরাতের মাঝে বাধা সৃষ্টি করে এবং আমাকে এতে বিভ্রান্ত করে ফেলে।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন,
‘ওটা এক শয়তান, যার নাম ‘খানযাব’। যখন তুমি তার উপস্থিতি অনুভব করবে, তখন আল্লাহর কাছে তার থেকে আশ্রয় চাইবে এবং তোমার বাম দিকে হালকা ভাবে তিনবার থুথু নিক্ষেপের ভঙ্গি করবে।’ (মুসলিম ২২০৩)
এ হাদিসের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা—
> নামাজে যে সন্দেহ ও অমনোযোগ তৈরি হয়, তা সাধারণত ‘খানযাব’ নামক শয়তানের কুমন্ত্রণা।
> মনে মনে ‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়া।
> বাম দিকে হালকা ভাবে তিনবার থুথু নিক্ষেপের ভঙ্গি করা (লালা ছাড়া)
এতে শয়তানের কুমন্ত্রণা দুর্বল হয়ে যায়—এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর পরীক্ষিত সুন্নাহ।
নামাজে রাকাত নিয়ে সন্দেহ হলে কী করবেন
নামাজে সন্দেহ হলে হাদিসে সিজদায়ে সাহুর নির্দেশ এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا شَكَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ فَلَمْ يَدْرِ كَمْ صَلَّى، ثَلَاثًا أَمْ أَرْبَعًا، فَلْيَتَحَرَّ الصَّوَابَ فَلْيُتِمَّ عَلَيْهِ، ثُمَّ لِيُسَلِّمْ، ثُمَّ لِيَسْجُدْ سَجْدَتَيْنِ
‘তোমাদের কেউ নামাজে দাঁড়ালে শয়তান এসে তাকে সন্দেহে ফেলে, এমনকি সে মনে করতে পারে না যে, সে কত রাকাত নামাজ আদায় করেছে। তোমাদের কারও এই অবস্থা হলে সে যেন বসা অবস্থায় দুটি সিজদা (সাহু) করে। (বুখারি ১১৬০)
এ হাদিসের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা—
নামাজে রাকাআত সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ হলে—
> যেটা বেশি সঠিক মনে হয়, সেটার ওপর ভিত্তি করে নামাজ পূর্ণ করবেন
> সালাম ফেরানোর পর দুটি সিজদায়ে সাহু করবেন
> এটি নামাজের ঘাটতি পূরণ করে এবং শয়তানের কৌশল ব্যর্থ করে দেয়
কুরআনের মূলনীতি: সন্দেহ নয়, নিশ্চিতের অনুসরণ
যদিও নামাজের সন্দেহ নিয়ে সরাসরি কুরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি নেই, তবে কুরআনের একটি মৌলিক নীতি এখানে প্রযোজ্য—
إِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا
‘নিশ্চয়ই সন্দেহ সত্যের কোনো বিকল্প নয়।’ (সুরা ইউনুস: ৩৬)
ফিকহের ভাষায় এই নীতিই দাঁড়িয়েছে:
ٱلْيَقِينُ لَا يَزُولُ بِٱلشَّكِّ
‘নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা নষ্ট হয় না’
বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা
> হালকা বা মাঝেমধ্যে সন্দেহ হলে সিজদায়ে সাহু দিতে হয়
> বারবার সন্দেহ (ওয়াসওয়াসা রোগের মতো) তাই সন্দেহ উপেক্ষা করা
> ওজু ভাঙার সন্দেহ নিশ্চিত না হলে ওজু বহাল থাকবে
> শয়তানি কুমন্ত্রণা হলে ‘আউজুবিল্লাহ’ পড়ে বাম পাশে ৩ বার থুথু ভঙ্গি করা
নামাজে সন্দেহ হওয়া ঈমানের দুর্বলতা নয়; বরং অনেক সময় তা ঈমানদার হওয়ার কারণেই হয়— কারণ শয়তান তাকেই বিরক্ত করে, যে আল্লাহর দিকে মনোযোগী। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়ে গেছেন, সন্দেহে ভেঙে পড়তে নয়; বরং সুন্নাহ অনুযায়ী দৃঢ়ভাবে তা মোকাবিলা করতে হয়। সুতরাং, সন্দেহ এলে ভয় নয়— ইলম ও আমলের মাধ্যমে শান্ত থাকাই মুমিনের পরিচয়। আল্লাহ আমাদের নামাজকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন। আমিন
কিউএনবি/আয়শা/০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/রাত ৮:১২