সিলেট প্রতিনিধি : পিঠার ঘ্রাণে মুখরিত প্রাঙ্গণ, গ্রামবাংলার রঙে সাজানো মাঠ আর দর্শনার্থীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে সিলেটে অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমধর্মী পিঠা উৎসব। সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে আয়োজিত এই পিঠা উৎসব যেন শুধু একটি মেলা নয়—বরং বাঙালির আবহমান সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শেকড়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের এক আবেগঘন পুনর্মিলন।
উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম বলেন, “পিঠা উৎসব আমাদের আবহমান সংস্কৃতির এক অনন্য ঐতিহ্য। সময়ের স্রোতে সেই পিঠা যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। আজকের এই আয়োজন সেই হারিয়ে যাওয়া স্বাদ আর মায়ের হাতের পরশকে আবার আমাদের সামনে ফিরিয়ে এনেছে।”
তিনি বলেন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখনকার পিঠায় মা-মাসিদের হাতের ছোঁয়া পাওয়া কঠিন হলেও সিলেট উইমেন চেম্বার সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে। নারী উদ্যোক্তাদের হাতের তৈরি পিঠার মাধ্যমে তারা বাঙালি ঐতিহ্যকে নতুন করে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি ভবিষ্যতেও কৃষ্টি ও সংস্কৃতি রক্ষায় অব্যাহত ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
সিলেট উইমেন চেম্বারের সভাপতি লুবানা ইয়াছমিন শম্পার সভাপতিত্বে এবং জান্নাতুল নাজনীন আশার প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুনাকের সভাপতি সিদরাতুল মুনতাহা, পুলিশ লাইন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিদ্যুত জ্যোতি চক্রবর্তী, যুক্তরাজ্যের বিশিষ্ট আইনজীবী আবদুর রব মল্লিক, উপ-পুলিশ কমিশনার সুদীপ্ত রায়সহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে পিঠা উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন চেম্বারের সহ-সভাপতি আলেয়া ফেরদৌসি তুলি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পুনাকের সভাপতি সিদরাতুল মুনতাহা বলেন, “আমরা ধীরে ধীরে আমাদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি, ফলে সৃজনশীলতাও হারিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা আগামী প্রজন্মের জন্য হুমকিস্বরূপ।” তিনি আরও বলেন, উইমেন চেম্বার আজ আমাদের আবহমান সংস্কৃতিকে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে এবং সন্তানদের সংস্কৃতি চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে লুবানা ইয়াছমিন শম্পা বলেন, এবারই প্রথমে মেলার মাঠে বেশি নারী উদ্যো্ক্তারা অংশগ্রহণ করেছেন।মেলার ৫৩ টি স্টল রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, পিঠাপুলিতে মা-মাসীদের আগেকার সেই পরশ তুলে দিতেই এমন উদ্যোগ। একই সাথে এর মধ্য দিয়ে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস মাত্র। উইমেন চেম্বার আগামী দিনেও এমন প্রয়াস অব্যাহত রাখতে বদ্ধ পরিকর।
এবারের পিঠা মেলায় মোট ৫৩টি স্টল অংশগ্রহণ করে। প্রতিটি স্টলে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ভাপা পিঠা, চিতই, পাটিসাপটা, দুধচিতইসহ নানা স্বাদের পিঠা নিয়ে হাজির হন সিলেটের নারী উদ্যোক্তারা। তাদের হাতের ছোঁয়ায় ঐতিহ্যবাহী পিঠা পেয়েছে নতুন স্বাদ, নতুন রূপ আর নতুন পরিচয়।
পিঠার স্বাদে, সংস্কৃতির আবেশে আর নারীদের উদ্যোক্তা শক্তিতে—সিলেটের এই পিঠা উৎসব প্রমাণ করেছে, ঐতিহ্য কখনো হারিয়ে যায় না; শুধু যত্ন আর ভালোবাসার স্পর্শ পেলেই তা আবার ফিরে আসে নতুন উজ্জ্বলতায়। উৎসবে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন-সিলেট উইমেন চেম্বারের পরিচালক সামা হক চৌধুরী, সাইমা সুলতানা চৌধুরী লিনু,রেহানা ফারুক শিরিন,জাকিরা ফাতেমা লিমি চৌধুরী, আসমাউল হাসনা খানম,তাহমিনা হাসান,গাজী জিনাত আফজা ও শাহানা আক্তার প্রমুখ।
কিউএনবি/আয়শা/৩১ জানুয়ারী ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:০০