জালাল আহমদ, ঢাবি : রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা মেধাবী শিক্ষার্থী মোঃ আবু তালিব ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের(ঢাবি) ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে সাধারণ ছাত্রদের মতোই হলে উঠেন।কিন্তু ছাত্রলীগের পাশবিক নির্যাতনের কারণে অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালের বিছানায় ছিলেন তিনি। চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে এখন ক্লাসে ফেরার আকুতি তার।
জানা গেছে, আবু তালিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষে ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার মেধা তালিকায় ১৫৬ তম হয়ে ইংরেজি বিভাগে ১ম বর্ষে ভর্তি হন।তিনি সাধারণ ছাত্রদের মতোই কবি জসীমউদ্দীন হলে উঠেন।হলে উঠার পর থেকেই তিনি তৎকালীন ছাত্রলীগের “গেস্টরুম” কালচার নামক নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং তা এড়িয়ে চলেন।ফলে তিনি ছাত্রলীগের রোষানলে পড়েন ।তাদের টার্গেটে পরিণত হন তিনি।
ছাত্রলীগের গুণ্ডারা আবু তালিব কে নিয়মিতভাবে শারীরিক ও মাননসিক নির্যাতন করতো ।এছাড়াও তারা অস্ত্র দেখিয়ে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে।একই সময়ে আবু তালিবের মা মারা যান।মা হারোনোর পর ছাত্রলীগের নির্যাতন তার জীবনে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়।ফলে তিনি ধীরে ধীরে মানসিক রোগে কিছুটা আক্রান্ত হতে থাকেন যা শুরুর দিকে পরিবার,শিক্ষকমণ্ডলী এবং বন্ধু-বান্ধব কেউ বুঝতে পারেন নি।ঠিক এই সময়ে হল এবং ক্যাম্পাসের মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের নিষ্ঠুর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন তাকে হতাশার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়।
তানভীর হাসান সৈকত(পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক) এর নেতৃত্বে তার অনুসারীরা এক গভীর রাতে তাকে কবি জসীম উদ্দিন হলের বাগানে নির্দয়ভাবে প্রহার করে। ছাত্রলীগের তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও তানভীর হাসান সৈকত তার উপর মধুর ক্যান্টিনে হামলা করেছিল বলে এই প্রতিবেদক কে নিশ্চিত করেন মধুর ক্যান্টিনের কয়েকজন কর্মচারী।ফলে বিভাগে তিনি ২০১৪-২০১৫ সেশনে পুনঃভর্তি হয়েও নিয়মিত হতে পারেন নি।পরবর্তী শিক্ষাবর্ষগুলোতে কিছুটা অসুস্থ অবস্থাতেই মাঝে মাঝে গোপনে ক্লাস করতে এসেছিলেন তিনি।
কিন্তু তিনি কনটিনিউ করতে পারেন নি।কারণ তালিব হল ও ক্যাম্পাসে প্রবেশের খবর পাওয়া মাত্র সৈকত তার অনুসারীদের নিয়ে চলে আসত তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে। তাদের এসব নির্যাতনের কথা তখন তিনি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় রিপোর্ট করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন।কিন্তু পত্রিকাটি বিভিন্ন বাধার কারণে সেই সময়ের পরাক্রমশালী ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে পারেনি।
তিনি তার বিভাগের শিক্ষক জয়নুল আবেদিন স্যার কেও বিষয়টি জানিয়েছিলেন।একদিন স্যার আবু তালিবকে ছাত্রলীগের হাত থেকে বাঁচাতে সিএনজি ভাড়া করে তার গন্তব্যে নামিয়ে দিয়ে আসেন।ছাত্রলীগের অকথ্য নির্যাতনের কারণে তিনি আরো অসুস্থ হতে থাকেন। একারণে বিভাগে মাঝে মাঝে আসলেও তিনি আর পুনঃভর্তি হতে পারেন নি ।এভাবে তিনি পুরোপুরি ডিপার্টমেন্ট থেকে ছিটকে পড়েন ও অসুস্থ হন।
তার পরিবার অসুস্থতার বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে পল্লী চিকিৎসক ও কবিরাজের কাছে কয়েকবার চিকিৎসা করান। পরে ডাকসুতে অসুস্থ অবস্থায় পেয়ে তার বন্ধু ডাকসুর সাবেক ভিপি ও গণ অধিকার পরিষদের বর্তমান সভাপতি নুরুল হক নুর তাকে ‘ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল’ এ ভর্তি করান।পরবর্তীতে, ‘পাবনা মানসিক হাসপাতাল’ ও ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট’ থেকেও তিনি চিকিৎসা নেন।
দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও ঔষধ সেবনের পর বর্তমানে তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ হয়েছেন বলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন। তিনি আবার বিভাগে পুনঃভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান।ঢাবির ইংরেজি বিভাগের প্রাণবন্ত সেই ক্লাসে ফেরার আকুতি মেধাবী শিক্ষার্থী আবু তালিবের।
কিউএনবি/আয়শা/৩০ জানুয়ারী ২০২৬,/রাত ৮:৩০