নিউজ ডেক্স : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির হেভিওয়েট ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের উপস্থিতি অস্বস্তি বাড়াচ্ছে মিত্রদের। জোট সমঝোতার মাধ্যমে মিত্রদের ছেড়ে দেওয়া ১৬টি আসনের মধ্যে আটটি আসনেও বিএনপির নেতারা বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। মিত্ররা পরাজিত হলেও হয় তারা জাতীয় সরকারে স্থান পাবেন, নয়তো জায়গা হবে উচ্চকক্ষে। এমনটাই জানিয়েছে বিএনপি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকেই জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের কথা বলেছি, যাদের সঙ্গে আমাদের ঐকমত্য আছে তাদের সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করব আমরা। মিত্রদের সেখানে কিভাবে রাখা হবে নির্বাচনের পর তা নির্ধারণ করা হবে। তিনি এও বলেন, আমরা মিত্রদের যথাযথ মূল্যায়নের চেষ্টা করেছি। আরও অনেক আসন ছাড় দেওয়া হতো, কিন্তু নির্বাচন কমিশনের আরপিও অনুসারে মিত্রদের নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে হচ্ছে।
ফলে অনেকেই নিজ প্রতীকে নির্বাচন করলে আসন নিয়ে শঙ্কা থাকে। এমন অবস্থায় কেউ কেউ আমাদের দলে যোগ দিয়ে নির্বাচন করছেন। আবার কেউ কেউ নিজ দলেরও প্রতীকেও করছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে মিত্রদের নিয়ে আরও আলোচনা হবে। ২০২৩ সাল থেকে বিএনপি বরাবর বলে আসছে-দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে ফ্যাসিস্টবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি ‘জনকল্যাণমূলক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ গঠন করবে। রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের রূপরেখায়ও বিষয়টি স্পষ্ট উল্লেখ আছে।
৩১ দফায় এও বলা হয়েছে, বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবীসহ অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সংসদে ‘উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা’ গঠন করবে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সরকারের কথা বলে আসছেন। সেখানে কারা, কিসের ভিত্তিতে স্থান পাবেন তাও বিএনপি নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে উঠে আসে। এছাড়া যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠক ও আসন সমঝোতা ইস্যুতে আলোচনার সময়ে মনোনয়ন বঞ্চিত মিত্রদের জাতীয় সরকার ও উচ্চকক্ষে নেওয়ার আভাস দিয়েছে বিএনপি।
সম্প্রতি গুলশান কার্যালয়ে মনোনয়ন বঞ্চিত মিত্র নেতারা বিএনপি হাইকমান্ডের সঙ্গে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ সাক্ষাৎ করেছেন। এদিকে, প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকলেও আসন সমঝোতার ভিত্তিতে মিত্রদের ১৬টি আসন ছেড়েছে বিএনপি। এর মধ্যে কয়েকজন বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্যরা নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করছেন। মিত্রদের ছেড়ে দেওয়া ৮টি আসনে বিএনপির পদে থাকা নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। যদিও বিএনপি তাদের দল থেকে বহিষ্কার করেছে। এমন অবস্থায়ও বহিষ্কৃত নেতারা ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকায় কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছেন মিত্র প্রার্থীরা।
এ প্রসঙ্গে গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আমরা বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে ছিলাম, এখনো আছি। আসন নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভের কিছু নেই। বিএনপি শুরু থেকেই বলেছে যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে সবাইকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্যরা কমবেশি আসন পেলেও গণফোরাম একটিও পায়নি। এটা নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভ তো থাকবেই। তবে আমরা এটা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছি।
গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন সামনে এলে নির্বাচনকেন্দ্রিক জোট হয়। একটা মেরুকরণ গড়ে ওঠে, এটা স্বাভাবিক। বিএনপির জোট সঙ্গীদের আসন সমঝোতা খুব ভালো কিছু হয়নি। অনেক অসন্তুষ্টি আছে, একটা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব নিশ্চয়ই আছে। সামান্য সংখ্যক আসনেই সমঝোতা হয়েছে। অসন্তুষ্টি থাকলেও এটা নিয়েই আমরা নির্বাচনে আছি। বিএনপি শেষদিকে এসে জোট সঙ্গীদের ব্যাপারটি প্রজ্ঞা নিয়ে সমাধান করতে পারেনি বলেও মনে করেন সাইফুল হক।
ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা অন্তত ১১টি দলের নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, আসন সমঝোতায় তারা কেউই ছাড় পাননি। কিছুটা অভিন্ন সুরে আসন বঞ্চিত মিত্র নেতারা বলেন, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে প্রত্যেকেই যার যার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। মিত্র দল ও নেতার সংখ্যা অনেক, কিন্তু আসন সংখ্যা সীমিত। সেক্ষেত্রে বিএনপি এবার বিভিন্ন উপায়ে ১৬ জনকে আসন ছাড় দিয়েছে। বাকিদের মধ্যেও কেউ কেউ নির্বাচনে জয়লাভ করার মতো যোগ্য।
তবে আসন সমঝোতা নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা তাদের আশ্বস্ত করেছেন, ক্ষমতায় যেতে পারলে জাতীয় সরকারসহ বিভিন্নভাবে মিত্রদের মূল্যায়ন করা হবে। তাই সবাই বিএনপি ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে তার আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন। আশা করছেন, জাতীয় সরকার কিংবা সংসদের উচ্চকক্ষে তাদের মূল্যায়ন করা হবে।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের প্রার্থী জোনায়েদ সাকি যুগান্তরকে বলেন, আমরা একটা জাতীয় পুনর্গঠনের লক্ষ্যে যুগপৎ ধারায় কাজ করছি। সেখানে বিভিন্নভাবে সমঝোতা হয়েছে। যেসব আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আছে সেগুলোতে এখনো কিছু সমস্যা আছে। আশা করি বিএনপির নেতারা সমাধান করবেন। মোটাদাগে একটা ইতিবাচক জায়গায় আছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকলেও যতটুকু সমঝোতা হয়েছে, তার ভিত্তিতে একটা ঐকমত্য রক্ষা করা দরকার। সেই জায়গায় আমরা জোর দিয়েছি। জাতীয় পুনর্গঠনের ন্যূনতম যে জাতীয় ঐকমত্য সেটার ওপরে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছি। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর যুগান্তরকে বলেন, আমরা যারা যুগপৎ আন্দোলন থেকে বিএনপির সঙ্গে আছি। তারপরও সব দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে একটা চাপা ক্ষোভ আছে। কেউ হয়তো প্রকাশ করছে, কেউ করেনি। আমরা দু-একটি আসনের জন্য রাজনীতি করিনি কিংবা এমপি হতে চাইনি।
তারপরেও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটা ঘোষণা আছে যে, দলটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় গেলে জাতীয় সরকার গঠন করবে। ফলে যেসব রাজনৈতিক দল আসনের দিক থেকে বঞ্চিত হয়েছে বা আসন সমঝোতা সঠিকভাবে হয়নি, জোট সরকার গঠন করে তখন বিভিন্নভাবে মূল্যায়নের সুযোগ আছে। এই কারণে হয়তো আসন সমঝোতার ক্ষোভটি স্পষ্ট হয়নি। কিন্তু আমাদের জন্য কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতি এখনো আছে। নুর বলেন, আমার আসনে এখনো বিএনপির বিদ্রোহী (বহিষ্কার) প্রার্থী রয়েছে। এই স্বতন্ত্র প্রার্থীকে প্রত্যাহার করা বিএনপিরই দায়িত্ব। এই বিষয়ে এখনো কোনো পদক্ষেপ দেখছি না।
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) এবার আসন চেয়েছিল অন্তত ৫টি। তবে শেষ মুহূর্তে দলটির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থকে একটি আসন ছাড় দেওয়া হয়েছে। দলটির মহাসচিব আব্দুল মতিন সাউদ ঢাকা-৫ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তবে শেষ মুহূর্তে বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে (লন্ডন থাকাকালীন সময়ে) ভার্চুয়ালি বৈঠক করেন তিনি। ওই বৈঠকে মতিন সাউদের বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয় বলে তিনি দাবি করেন। শুক্রবার বিজেপি মহাসচিব যুগান্তরকে বলেন, তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠককালে তিনি নিজে বলেছেন আমাকে একটা সম্মানজনক জায়গা দেবেন। উনার কথায় সন্তুষ্ট হয়েছি। আমরা আশাবাদী, জাতীয় সরকার গঠন করা হলে, সেখানে মিত্র দলগুলোর নেতারা থাকবেন।
কিউএনবি/মহন/ ১৭ জানুয়ারি ২০২৬,/দুপুর ২:২৫