সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:০৬ পূর্বাহ্ন

ভারতের দাদাগিরি বাংলাদেশ-নেপালকে ঠেলে দিয়েছে চীনের দিকে

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৫৯ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : নেপালে সম্প্রতি জেন-জি দের আন্দোলনের কারণে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারত এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশটির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করার সুযোগ পেয়েছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, ভারতের এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হবে না, যা ‘বড় ভাই’ বা ‘আঞ্চলিক মোড়ল’ হিসেবে হস্তক্ষেপের ধারণাকে উসকে দেয়। অতীতে ভারতের এমন ‘দাদাগিরি’র কারণেই নেপাল ও বাংলাদেশ চীনের দিকে ঝুঁকেছে।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারতের এ কূটনৈতিক উদ্যোগ অবশ্যই ‘বড় ভাই’ হিসেবে হস্তক্ষেপমূলক মনে না হওয়ার মতো হতে হবে। কারণ, অতীতে ভারতের এমন আচরণ নেপাল ও বাংলাদেশকে চীনের ঘনিষ্ঠ করেছে। কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক গবেষণা স্কুলের শিক্ষক ডি বি সুবেদি বলেন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি স্থিতিশীল প্রতিবেশী অত্যন্ত জরুরি। দুদেশের উন্মুক্ত ও অরক্ষিত সীমান্তের কারণে নেপালের যেকোনো অস্থিরতা ভারতের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।

সুবেদি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ‘বড় ভাই’ বা ‘আঞ্চলিক মোড়ল’ (হেজেমন) হিসেবে একটি ধারণা বিদ্যমান। তাই নেপালের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ভারতকে কূটনৈতিকভাবে সতর্ক হতে হবে। তিনি সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামাবাদ ও ঢাকার সঙ্গে দিল্লির বাড়তে থাকা উত্তেজনার দিকেও ইঙ্গিত করেন।

উল্লেখ্য, গত এপ্রিলে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে এক হামলায় ২৬ জন ভারতীয় নিহত হন। এ ঘটনার জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করে এবং পাকিস্তানে বিমান হামলা চালায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারত চলে যাওয়ার পর দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কেও টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।

এর মধ্যে গত মার্চে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরের পর বাংলাদেশ চীনের আরও কাছাকাছি চলে এসেছে। ওই সফরে উভয় দেশ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কিছু চুক্তি সই করে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ চীন থেকে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পায়।

এ ছাড়া গত এপ্রিলে বেশ কিছু ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, চীন ভারতের পূর্ব সীমান্তের কাছাকাছি লালমনিরহাট জেলায় একটি বিমানঘাঁটি নির্মাণ করতে পারে। এটি ভারতের ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডরের কাছে অবস্থিত। চায়না অ্যান্ড এশিয়া থিংকট্যাংকের জ্যেষ্ঠ গবেষক ওমকার ভোলে বলেন, নেপালে জেন-জি আন্দোলনের মূল কারণ ব্যাপক দুর্নীতি ও বেকারত্ব। তার মতে, ভারতের উচিত এই দেশগুলোর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করা, যা দীর্ঘ মেয়াদে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

বেইজিং ইতিমধ্যে কাঠমান্ডুর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুশীলা কার্কিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছে এবং বলেছে, তারা নেপালের জনগণের স্বাধীনভাবে বেছে নেওয়া উন্নয়নপথকে সম্মান করে। ওমকার ভোলে আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা চীনকে ‘তার উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ দিয়েছে’, যা অবশ্যই ভারতের স্বার্থের পরিপন্থি। তিনি বাংলাদেশের উদাহরণ টেনে বলেন, ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকারের বেইজিংমুখী ঝোঁক ভারতের জন্য, বিশেষ করে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য উদ্বেগের কারণ।

বিশ্লেষকেরা বলেন, ভারত ও চীনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নেপালের কৌশলগত অবস্থানের কারণে দিল্লির উচিত কাঠমান্ডুর প্রতি তার পররাষ্ট্রনীতি সতর্কতার সঙ্গে সাজানো। ডি বি সুবেদি বলেন, অতীতের শাস্তিমূলক ও প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপের পরিবর্তে বর্তমানের সংকট ও অস্থিরতায় ভারতের সবচেয়ে ভালো বিকল্প হবে নেপালের সঙ্গে গঠনমূলক ও ধারাবাহিক কূটনীতি বজায় রাখা। ২০১৫ সালে নেপালের সংবিধানে মধেশিদের উপেক্ষার অভিযোগ তুলে ভারত চার মাসেরও বেশি সময় অঘোষিত অবরোধ আরোপ করেছিল। এতে ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত নেপালের অর্থনীতি ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয় এবং চীনের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে কাঠমান্ডু।

বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ভারতকে সতর্কভাবে কূটনীতি পরিচালনা করতে হবে। শাস্তিমূলক বা প্রতিক্রিয়ামূলক পদক্ষেপ না নিয়ে ভারতের উচিত গঠনমূলক ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া।

অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন নামে একটি ভারতীয় থিংকট্যাংকের গবেষক শিবম শিখাওয়াত মনে করেন, ভারতের নীতি হওয়া উচিত উন্নয়ন সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সংযোগ জোরদার করা। এ ছাড়া দুর্নীতি, বেকারত্ব ও দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে সহযোগিতা করলে তা সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক সাড়া ফেলবে।

নেপাল এখন এক বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিক্ষোভকারীদের দাবি মোকাবিলা করা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। এমন পরিস্থিতিতে ভারত যদি প্রতিবেশীর মতো আচরণ করে, তবে নেপাল ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তবে ‘বড় ভাই’ ভাবমূর্তিকে জিইয়ে রাখলে বা দাদাগিরি করলে উলটো চীনের প্রভাবই আরও শক্তিশালী হবে।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, /বিকাল ৫:০৫

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

February 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit