ডেস্কনিউজঃ “এই যে হাজার দুয়েক লোক, টোকায়ে নিয়ে আসবো আমরা। বাড়ি বাড়ি থেকে টোকায়ে নিয়ে আসবো।
মাটির তলায় ঢুকলে সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসবো”—বিরোধী দলমতের নেতা-কর্মীদের দমন-পীড়নে অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদ পুলিশপ্রধান (আইজিপি) থাকাকালে এমনই দম্ভোক্তি করেছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, জমি দখলসহ নানা কেলেঙ্কারি সামনে এলে গোপনে সপরিবারে দেশ ছেড়ে পালান।
অবশেষে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে তাকে দুবাই থেকে গ্রেপ্তার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশ।
দুর্নীতির মামলায় বেনজীর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ নিয়ে আবারও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের বিদেশে অর্থপাচার ও সম্পদ গড়া নিয়ে আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে নানা কানাঘুষা চলছে। তদন্ত সূত্র বলছে, বাংলাদেশ ছাড়াও বেনজীরের কাছে পর্তুগালের পাসপোর্ট আছে।
‘গোল্ডেন ভিসা’র মাধ্যমে পর্তুগালের নাগরিকত্ব নেন বেনজীর। পূর্ব ইউরোপের আটলান্টিক মহাসাগর উপকূলবর্তী দেশটির গোল্ডেন ভিসা পেতে পাঁচ লাখ ইউরো বিনিয়োগ করতে হয়, যা বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ৭ কোটির বেশি। এছাড়া তার কাছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসের অনুমতিপত্র ছিল।
পর্তুগালের কয়েকটি সূত্র বলছে, দেশটিতে বেনজীর আহমেদের অঢেল সম্পত্তি রয়েছে। তার অন্তত ৫২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পাঁচটি বিলাসবহুল বাড়ির খবর পাওয়া যায়। এসব সম্পত্তি বেনজীর আহমেদের চাচাতো ভাই ও কতিপয় আওয়ামীপন্থী প্রবাসী সাংবাদিক দেখভাল করেন বলে জানা গেছে। তবে এসব বিষয় নিয়ে সরাসরি কেউ নাম প্রকাশ করে কথা বলতে চাননি।
পর্তুগাল থেকে বেনজীরের অবৈধ সম্পদ ফেরাতে চায় সরকার
গত সোমবার (১৫ জুন) রাজধানী লিসবনের একটি রেস্টুরেন্টে পর্তুগাল বাংলা প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সরকারী ড. এস এম জিয়া উদ্দিন হায়দার।
সেখানে পর্তুগালে বেনজীর আহমেদের অবৈধ সম্পদ বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা, পর্তুগাল বাংলা প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি আমিরুল ইসলামের প্রশ্ন করলে বিশেষ সহকারী জানান, বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে কাজ করবে।
তিনি স্পষ্ট করেন, শুধু পর্তুগাল নয়, বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সম্পত্তি ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সরকার কাজ করবে।
এ সময় ড. হায়দার সাংবাদিকদের কাছে পর্তুগাল প্রবাসীদের সমস্যাগুলো জানতে চান এবং সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশে পর্তুগালের দূতাবাস স্থাপন ও প্রবাসীদের কার্ড সংক্রান্ত ব্যাপারেও তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পর্তুগালে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স লায়লা মুনতাজেরী দীনা এবং দূতালয় প্রধান এস এম গোলাম সরোয়ার, পর্তুগাল বাংলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি রাসেল আহমেদ, সহ-সভাপতি আমিরুল ইসলাম প্রমুখ।
‘এমন কোনো কুকীর্তি নেই, যেটা বেনজীর করেননি’
বেনজীর গ্রেপ্তার হওয়ার পর সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, কত ফ্ল্যাট, কত জায়গা, কত জমি আছে তার স্ত্রীর নামে, তার সন্তানদের নামে। তার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার সন্ধান পাওয়া যায় দেশে-বিদেশে। এমন কোনো কুকীর্তি নেই, যেটা বেনজীর আহমেদ করেননি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা এক সময় জানতাম তিনি সারা বাংলাদেশকে চালাচ্ছেন। তার ওপরে কাউকে মানুষ মনে হতো না। তার যে দম্ভোক্তি, তার যে বডি ল্যাংগুয়েজ সব কিছু মিলিয়ে তখন বাংলাদেশে কোনো কোনো জায়গায় শেখ হাসিনার চেয়েও বেশি পরিচিত ছিলেন বেনজীর আহমেদ। এ পরিচিতির কারণ হলো তিনি হেন কোনো দুষ্কর্ম নাই যেটা তিনি তার কর্মজীবনে করেন নাই। আমরা ধারণা করি আওয়ামী লীগের শেষ আমলে তাদের কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দলে তাদের কোনো কুশীলব তার এ কুকীর্তি প্রকাশ করে দেয়।
বন্দুকযুদ্ধের অভিযোগ মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায়
২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন একরামুল হক। ঘটনার কিছু সময় আগে মেয়ের সঙ্গে একরামুলের কথোপকথনের একটি ফোনকল রেকর্ড কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠে বিভিন্ন অভিযানের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে। সে সময় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) ছিলেন বেনজীর আহমেদ। ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তাকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) করা হয়।
২০১৩ সালে বেনজীর আহমেদ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার ছিলেন। ওই বছর ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে যে অভিযান চালানো হয়েছিল, সেই অভিযানে হেফাজতের অনেক নেতাকর্মী হতাহত হন। ওই সমাবেশ ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ৫৮ জন হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বেনজীর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এমন আরও অনেক দমন-পীড়নসহ তার অধীন সংস্থার বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল। এজন্য ২০২১ সালে র্যাবের যে ছয় কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়, তাদের মধ্যে বেনজীরও ছিলেন।
অবৈধ সম্পদ অর্জনের যত অভিযোগ
বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পৃথক চারটি মামলা রয়েছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তার স্ত্রী জীশান মীর্জার বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া তাদের বড় মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং মেজ মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের নামে ঢাকার গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, তিনটি বিও হিসাব এবং ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের তথ্য পাওয়া যায়। দুদকের আবেদনের পর আদালত এসব সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেন। দুদকেরই মামলায় গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আদালত ইন্টারপোলের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।
দুদকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেনজীরের ঋণ হিসেবে নেওয়া ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার কোনো বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া যায়নি; অর্থ উত্তোলনের পরই তিনি বিদেশে চলে যান। দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি দেশ ত্যাগ করেন।
অন্যদিকে, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে কয়েকশ’ বিঘা জমি কেনার ক্ষেত্রেও নানা অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকের দাবি, ভয়ভীতি, চাপ ও বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে জমি কেনা হয়েছে। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগীটোল গ্রামে ৬০০ বিঘার বেশি জমির ওপর গড়ে তোলা হয় সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক, যা পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে জব্দ করা হয় এবং ২০২৪ সালের জুনে এর নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ২৪ কাঠা জমির ওপর তার মেয়ের মালিকানায় ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে একটি বাড়ি নির্মাণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এর আগে স্থানীয় একটি জলাশয় ভরাট করে পরে সেই জমি ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় কিনে নেন বেনজীর আহমেদ।
কিউএনবি/বিপুল/১৬.০৬.২০২৬/রাত ৮.৫১