এম এ রহিম , চৌগাছা ( যশোর) : যশোরের চৌগাছা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হুদাপাড়া গ্রামের শতবর্ষী শিক্ষক আয়ুব হোসেনের বয়স দাবী অনুযায়ী ১২১ বছর। অবসরপ্রাপ্ত এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এখনও প্রতিদিন নিজেই কয়েক কিলোমিটার হেঁটে চৌগাছা শহরে যান, পত্রিকা কিনেন, ব্যাংকে গিয়ে নিজের পেনশনের টাকা তোলেন, এমনকি অফিসেও যান। চশমা ছাড়াই খালি চোখে পত্রিকা পড়তে পারেন তিনি।
তাঁর অসাধারণ কর্মক্ষমতা ও জীবনযাপন দেখে মুগ্ধ হয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে কিছু ফলমূল উপহার নিয়ে তাঁর বাড়িতে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ইসলাম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ইউএনও অফিসের স্টাফ শাহজালাল, একজন আনসার সদস্য এবং গাড়িচালক।
নিজ বাড়িতে ইউএনওকে দেখে প্রবীণ এই শিক্ষকের আনন্দের সীমা ছিল না। সাদাসিধে ভাষায় নিজের জীবনের গল্প বলতে থাকেন। স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনিদের কথা তুলে ধরেন। বলেন, “মাস শেষে পেনশনের টাকা পেলে যদি বউমাকে এক হাজার টাকা দিই, তাহলে বড় ছেলের মেয়েরা এসে বলে, ‘দাদু, আমাকেও দাও।’” বলেই শিশুসুলভ এক হাসি হাসেন তিনি।
ইউএনওকে চা খাওয়াবেন বলে জোর ধরেন আয়ুব মাস্টার। শেষে বড় ছেলের দোকানে নিয়ে গিয়ে নিজ হাতে তুলে দেন চায়ের কাপ। বিদায়ের সময় বলেন, “মা, আবার এসো। তোমার বউমা বেঁচে থাকলে কত যত্ন করতো! এবার এসে ভাত খেয়ে যেও।”
উত্তরে ইউএনও বলেন, “স্যার, আপনি চৌগাছা এলে আমার অফিসে অবশ্যই আসবেন।” স্যার রাজিও হন। আয়ুব হোসেন কলকাতা থেকে পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন ব্রিটিশ আমলে। তখন তাঁর বেতন ছিল ১৭ টাকা, যা দিয়ে ভালোভাবেই চলতো বলে জানান তিনি। এরপর পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ—তিন যুগেই তিনি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রৌপ্যমুদ্রায় বেতন পেয়েছেন এমন অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মরহুম একে শফিউদ্দিন আহমেদ, যিনি চৌগাছা সরকারি শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি ২০০৪ সালে অবসর নেন এবং ২০১২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। আয়ুব হোসেনের হাতে গড়া অনেক শিক্ষার্থী আজ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও রাজনৈতিক নেতা।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা রফিউদ্দীনকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। চৌগাছা ডাকবাংলো এবং মাসিলা ক্যাম্পের মাঝামাঝি তাঁর বাড়ি হওয়ায় এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি নিজের বড় মেয়ে সুফিয়া খাতুনকে রফিউদ্দীনের সঙ্গে বিয়ে দেন এবং প্রচার করেন তিনি ঘরজামাই। একসময় পাক হানাদার বাহিনী তাঁর বাড়িতে হানা দিয়েছিল, কিন্তু গ্রামবাসীর সহযোগিতায় বিপদ এড়াতে সক্ষম হন তিনি।
এই শতবর্ষী শিক্ষক চৌগাছার কয়েক প্রজন্মের শিক্ষক। কারো বাবার স্যার, কারো দাদার স্যার—তাই তিনি আজ সবার ‘আয়ুব মাস্টার’।
কিউএনবি/আয়শা/১০ এপ্রিল ২০২৫,/রাত ৯:৫৩