শেখ হাসিনা : কোথায় গেলে মিলবে যে ঠাঁই ?
—————————————————-
সাড়ে ১৫ মাস ! শেখ হাসিনা একটানা সাড়ে ১৫ মাস ক্ষমতায় ছিলেন। এই ক্ষমতা পর্বের শুরু থেকেই ছিল ষড়যন্ত্র। ২০০৭ সালে ১/১১ সৃষ্টি করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ১/১১ এর সরকার আমার আন্দোলনের ফসল। এই আন্দোলন ছিল বিএনপিকে থামিয়ে দেয়ার আন্দোলন।
এরপরের কাহিনী সকলরই জানা। সেফ এক্সিট দেয়ার নামে মঈনুদ্দিন -ফখরুদ্দিন গং ক্ষমতা তুলে দেয় শেখ হাসিনার হাতে। বিএনপির হাত পা বেঁধে সে নির্বাচনে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। বিএনপির জনপ্রিয় প্রার্থীদের কারারুদ্ধ করে সে নির্বাচন ছিল নামকাওয়াস্তের এক নির্বাচন।
তারপরের কাহিনী গণতন্ত্র ধ্বংসের এক ইতিহাস মাত্র। জনপ্রিয় এবং প্রতিষ্ঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা তত্ববধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করার অভিপ্রায়ে শেখ হাসিনা বিনাভোটের নির্বাচন করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীতে। এরই ধারাবাহিকতায় ৫ বছর মেয়াদান্তে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতের ভোটে ক্ষমতা নবায়ন করা হয়। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারীতে সর্বশেষে ডামি নির্বাচন করে শেখ হাসিনা ক্ষমতার মেয়াদকাল ১৫ বছর অতিক্রম করে।
১৫ বছরের রথযাত্রা শেষ হয়ে গেল মাত্র ৬ মাসের মাথায়। জুলাই ২০২৪ এ সৃষ্ট ছাত্র আন্দোলন গণ আন্দোলনে পরিণত হয়। খুব বেশিনা ৩৬ দিনের মাথায় শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এই পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে আওয়ামী ডাইন্যাসটির আপাততঃ পরিসমাপ্তি ঘটে।
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর দলটি এখন নেতৃত্ব শূন্যতায় ভুগছে। অথচ গত ২৩ জুন আওয়ামী লীগের ৭৫ বছরপূর্তি পালনেও পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত সমাবেশে নেতাকর্মীর উপস্থিতি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। কিন্তু মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি পাল্টে গেছে।
শেখ হাসিনা ভারত পালিয়ে যাওয়ার পর শীর্ষ নেতারাও অনেকে দেশ ছেড়েছেন। আবার কেউ কেউ ‘দেশ ছাড়ার চেষ্টাকালে’ গ্রেফতার হয়েছেন। এছাড়া নেতাদের মধ্যে এখনো যারা দেশে অবস্থান করছেন, তাদের প্রায় সবাই ‘আত্মগোপনে’ আছেন।
বর্তমানে নেতৃত্ব শূন্য থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চরম হতাশায় ভুগছে। তাদের অনেকেই এখন উদ্বগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সংবাদমাধ্যমে কথা বলার সময় তারা তাদের নামও প্রকাশ করতে চাননি।
আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের একজন নেতা বলেন, ‘আমাদের দলের এখন দিশাহারা বিপর্যস্ত অবস্থা হয়ে গেছে। কারণ একমাস হয়ে গেলো অথচ কেন্দ্র থেকে কার্যকর কোনো নির্দেশনা দেওয়া হলো না। ফোন দিলেও কেউ ধরে না। হামলা-মামলা সব মিলিয়ে নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় নেতাকর্মীদের অনেকে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।’
অপর দিকে শেখ হাসিনার সর্বশেষ অবলম্বন শুধু এটুকুই- ভারতের দয়া আর আনুকূল্য মাত্র। যে মুহূর্তে ভারত বলবে ইউ আর নো মোর, ঠিক সে মুহূর্তেই তাকে ভারত ত্যাগ করতে হবে। এই বিশাল পৃথিবীতে তার আর কোন স্থান নেই। বাংলাদেশে ফিরে আসা মানেই তাকে গণহত্যার দায় মাথায় নিয়ে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
প্রকৃতি অস্বাভাবিকতা গ্রহণ করেনা। বিনা অপরাধে শেখ হাসিনা খালেদা জিয়াকে কারারুদ্ধ করেছেন, গৃহছাড়া করেছেন, চিকিৎসার কোন সুযোগ দেয়নি। আজ সেই খালেদা জিয়া সম্মান ও শ্রদ্ধার আসন নিয়ে বহাল তবিয়তে বাংলাদেশেই আছেন। কিন্তু নেই শেখ হাসিনা।
সাড়ে ১৫ বছর এখন শেখ হাসিনার কাছে দুঃস্বপ্নের এক প্রহর মাত্র। এই বাংলাদেশ তার জন্যে শত্রুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এই বাংলাদেশ তাকে সাড়ে তিন হাত মাটিও দিতে প্রস্তুত নয়। বাংলাদেশকে বধ্যভূমিতে পরিণত করার নিষ্ঠুর এক পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে তাকে। হিসাবের খাতায় হিসাব মিলানো এখন কঠিন হয়ে গেছে তার জন্যে। শেখ হাসিনা হিসাব মিলাতে পারেন না, কোথায় গেলে মিলবে ঠাঁই ?
লেখকঃ লুৎফর রহমান একজন রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক নিউজ মিডিয়ার সম্পাদক ও প্রকাশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র লুৎফর রহমান ৮০ এর দশকের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরতে চারটি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় জীবনের খন্ডচিত্র এঁকে তিনি এখন ব্যাপক পরিচিত পাঠক মহলে।
কিউএনবি/বিপুল/০৬.০৯.২০২৪/দুপুর ২.১০