বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ১০:০২ অপরাহ্ন

আত্মার পরিশুদ্ধি কেন প্রয়োজন

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ১০ মার্চ, ২০২৪
  • ৭৬ Time View

ডেস্ক নিউজ : জ্ঞানগত পর্যালোচনা, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং সাধারণ, শিক্ষিত, উদাসীন ও আলেমসহ মুসলিম সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির সঙ্গে মেশার ফলে আমার কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে সব শ্রেণির মুসলমানের জন্য সত্যিকার ঈমানি শিক্ষা ও অনুশীলন অপরিহার্য, যা তাদের আল্লাহমুখী করবে এবং যার মাধ্যমে তাদের অন্তর পরিশুদ্ধ হবে দুনিয়ার মোহ ও আত্মপূজা থেকে। ঈমানি শিক্ষা ও ঈমানের অনুশীলন মানুষকে বস্তু, প্রবৃত্তি ও কল্পনার আনুগত্য থেকে মুক্তি দেয়। তা মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতে আবদ্ধ করে এবং পবিত্র রাখে বিশ্বাসকে শিরক থেকে, অন্তরকে কপটতা থেকে, জিহ্বাকে মিথ্যা থেকে, চোখকে খেয়ানত থেকে, কথাকে অর্থহীন বাক্যব্যয় থেকে, ইবাদতকে প্রদর্শন থেকে, লেনদেনকে প্রতারণা থেকে এবং জীবনকে দ্বন্দ্ব থেকে। আর এই পুরো বিষয়টিকে এককথায় বলা হয়, তাজকিয়াতুন নাফস বা আত্মশুদ্ধি।

ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির জন্য মানুষের আত্মশুদ্ধি অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘শপথ মানুষের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন। অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও তার সৎকর্মের জ্ঞান দান করিয়েছেন। সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।’ (সুরা : শামস, আয়াত : ৭-১০)

আরবি তাজকিয়া শব্দটি জাকাত থেকে উদ্ভাবিত। অর্থ পবিত্রতা ও প্রবৃদ্ধি। আত্মার পবিত্রতা হলো কপটতা ও পাপাচার থেকে মুক্তি লাভ। আর প্রবৃদ্ধি হলো ঈমান ও উত্তম গুণাবলিতে নিজেকে সুসজ্জিত করা।

আধ্যাত্মিক সাধকদের ভাষায় তাকে ‘তাখাল্লিয়া’ ও ‘তাহাল্লিয়া’ বলা হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ আত্মশুদ্ধিকে কোরআন ও হিকমত শিক্ষাদানের মতো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মৌলিক কাজ ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করেছেন যে তিনি তাদের নিজেদের মধ্য থেকে তাদের কাছে রাসুল প্রেরণ করেছেন, যে তাঁর আয়াতগুলো তাদের কাছে তিলাওয়াত করে, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, যদিও তারা আগে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিল।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৬৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। ফলে তাঁর হাতে তৈরি হয়েছিল এমনকটি দল, যারা ঈমান, ইবাদত, নীতি-নৈতিকতা ও আল্লাহর সংগ্রামের ক্ষেত্রে পৃথিবীতে অদ্বিতীয় ও দৃষ্টান্তহীন। আর শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন অতুলনীয়।

পার্থিব জীবনে মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জন করা, সুরা ফাতহর শেষে আল্লাহ যে গুণাবলি বর্ণনা করেছেন তা অর্জন করা এবং জীবনে ঈমানের শাখা হিসেবে বর্ণিত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা যেন আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। সর্বোপরি সে যেন ইহসানের স্তরের উপনীত হয়, যার পরিচয় রাসুলুল্লাহ (সা.) এভাবে দিয়েছেন, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ, আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে (মনে করবে) তিনি তোমাকে দেখছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০)

মানুষের জন্য আবশ্যক হলো অন্তরের ত্রুটি, আত্মার ব্যাধি, প্রবৃত্তির তাড়না, শয়তানের প্রতারণা সম্পর্কে অবগত হওয়া। যেন সে এগুলো থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে। চিকিৎসার চেয়ে আত্মরক্ষাই শ্রেয়। কিন্তু মানুষ কিভাবে চিকিৎসা করবে, যখন সে নিজেই রোগে নিমজ্জিত। আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার আরোগ্য নেই। জ্ঞানীরা রোগ ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে অবগত আর মূর্খরা রোগ ও আরোগ্যের ব্যাপারে উদাসীন। দুঃখের বিষয় হলো, মানুষ শারীরিক ব্যাধি সম্পর্কে সচেতন এবং অন্তরের ব্যাধি সম্পর্কে উদাসীন। যখন তাকে সতর্ক করা হয়, তখন সে বলে, অন্তরের চিকিৎসা কোথায় পাওয়া যাবে। ধরে নিলাম, আলেমরা অন্তরের ব্যাধির চিকিৎসা করবেন। কিন্তু তাঁরাই তো বহু রোগের আকর। নাউজুবিল্লাহ!

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদীকে কখনো কল্যাণশূন্য করবেন না। বস্তুবাদী পৃথিবীর নৈরাজ্যের মধ্যেও আল্লাহর বহু বান্দা তাঁর আনুগত্য, ভালোবাসা ও সান্নিধ্য লাভে পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরাই মানুষকে বিশুদ্ধ ঈমান, নিষ্ঠাপূর্ণ আনুগত্য ও নিখাঁদ ভালোবাসার দীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।

মানুষের জন্য আবশ্যক হলো আল্লাহ প্রেমের আগুনে পুড়ে খাঁটি হওয়া। যেন তারা শয়তানের পূজারি থেকে আল্লাহর বান্দা, অর্থ-বিত্তের পূজারি থেকে পরকালের কল্যাণপ্রত্যাশী হতে পারে। তাদের জন্য আবশ্যক হলো আল্লাহর আনুগত্যে সৎ হওয়া এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা। এটাই তাসাউফের মূলকথা, তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিরও সারকথা এটাই, দ্বিনদারির ব্যাখ্যাও এটা। এই কথার প্রতি ইঙ্গিত মেলে কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে—‘আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা আল্লাহভীতি অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মপরায়ণ।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৮)

আত্মিক পরিশুদ্ধি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ভালোবাসা ও সান্নিধ্য লাভের এমন পথ যার গন্তব্য সুস্পষ্ট, যা পরিচ্ছন্ন, যা আল্লাহর বিধান অনুসারে পরিচালিত, যা আল্লাহর রাসুলের সুন্নতের অনুসারী, পূর্বসূরি বুজুর্গরা যে পথে চলেছেন। একই সঙ্গে যে পথ মুক্ত হবে সব ধরনের বিদআত, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের বিকৃতি থেকে। যে পথে চললে আত্মা পরিশুদ্ধ হয়, হৃদয় প্রশান্ত হয়, মনে সজীবতা আসে, ঈমান দৃঢ় হয়, আমলের সৌন্দর্য বাড়ে, চরিত্র সুন্দর হয়, সর্বোপরি মনুষ্যত্ব তৈরি হয়। ঈমান ও ইসলামের পরিপন্থী কোনো পথ ও পদ্ধতি উদ্দেশ্য নয়।

আল্লাহ সবার ঈমান দৃঢ় করেন এবং আত্মা পরিশুদ্ধ করেন। আমিন।

আল হায়াতুর রব্বানিয়া থেকে আলেমা হাবিবা আক্তারের ভাষান্তর

কিউএনবি/অনিমা/১০ মার্চ ২০২৪/বিকাল ৩:৪১

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

March 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit