লাইফ ষ্টাইল ডেস্ক : বাংলাদেশের সমাজে বিয়েকে সবচেয়ে বড় সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি বলে গণ্য করা হয়। বিশেষ করে সাজসজ্জা, খাওয়া-দাওয়া, নানা ধাপের আয়োজন, উপহার-উপঢৌকনের সমারোহে চাঁদের হাট বসে দুটি পরিবারের এ মেলবন্ধনকে কেন্দ্র করে। আয়োজনের পরিধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে ব্যয়। এমনিতেই ব্যয়সাধ্য এ আয়োজন, তার মধ্যে বর্তমান বাজারে বিয়ের বাজার এখন আকাশচুম্বী।
বিয়ের বাজার এমন অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যেখানে নিম্নবিত্ত তো নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্তদেরও খরচ সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ বাজারে গহনা, পোশাক, সাজসজ্জা, হল ভাড়া এবং আপ্যায়ন বাবদ মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের বিয়ের খরচ কম করে হলেও ১০ লাখ টাকা।
শফিকুল হক সময় সংবাদকে বলেন, ধনীদের কেউ কেউ বিয়ের কেনাকাটা করার জন্য দেশের বাইরে যান। তাদের অনেকের বিয়ের বাজেট ৫০ লাখ থেকে কোটি টাকার ওপরেও চলে যায়। অপরদিকে একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বিয়ের খরচ জোগাতেই হিমশিম অবস্থা। মধ্যবিত্তরা ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায় বিয়ের খরচ সারতে পারলেও, নিম্নবিত্তদেরও গুনতে হয় অন্তত ১ থেকে ৫ লাখ টাকা।
কথা হয় সম্প্রতি মেয়ের বিয়ে দেয়া তপন দত্তের সঙ্গে। পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। মাসিক আয় ৪০ হাজার টাকার কিছু ওপরে। তিনি জানান, বিয়ের সম্পূর্ণ খরচ জোগাতে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিতে হয়েছে। কারণ, বর্তমানে সাজসজ্জা, খাওয়া-দাওয়ার খরচ অনেক বেড়েছে। আর গহনার দাম তো নাগালের বাইরে।
ধরাছোঁয়ার বাইরে স্বর্ণের বাজার
বিয়ের ক্ষেত্রে কনের গহনার হিসাব আসে সবার আগে। তপন বলেন, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত পর্যায়ে বর্তমান সময়ে এসে বিয়ের ক্ষেত্রে কনেকে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ ভরি স্বর্ণ দেয়া লাগে। বর্তমানে স্বর্ণের ভরি ১ লাখ ১০ হাজার টাকার ওপরে। এতে স্থানভেদে মজুরিসহ এক ভরি স্বর্ণের গয়নার দাম পড়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মতো।
পুরান ঢাকার তাঁতিবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস জানান, বর্তমানে বাজারে স্বর্ণের দাম বেশ চড়া। বাজুসের সবশেষ তথ্যানুযায়ী প্রতিভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম ১ লাখ ১২ হাজার ৪৪১ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতিভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৭ হাজার ৩০৮ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতিভরি ৯২ হাজার ২৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতিভরির দাম ৭৬ হাজার ৬৩২ টাকা। তার সঙ্গে রয়েছে মজুরি খরচ।
ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে সীতাহারজাতীয় গহনার দাম আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা থেকে শুরু হয় জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বিয়ের জন্য সীতাহারের পাশাপাশি হাতের কাঁকন, গলার চেইন, মাথার টিকলি-টোপর, আঙুলের আংটি কেনেন গ্রাহকরা। সব মিলিয়ে স্বর্ণের গহনা বাবদ অন্তত ৫ থেকে ৬ টাকা খরচ হয়।শীতের মৌসুমে বিয়ের অনুষ্ঠান বেড়ে যাওয়ায় কাজের চাপ বাড়ায় কারিগররা মজুরি কিছুটা বেশি নিচ্ছেন বলেও জানান পিন্টু। তিনি বলেন, শীতকালে বিয়ের অনুষ্ঠান বেশি হয়। এতে কারিগরদের ওপর গহনা তৈরির চাপ বেশি পড়ে। এ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত সময় কাজ করায় কারিগররা বেশি মজুরি নিচ্ছেন। যার প্রভাব গহনার দামেও পড়ছে।
সাজসজ্জা
বিয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ সাজসজ্জা। বর-কনে সাজানো থেকে শুরু করে বিয়ের গেট, স্টেজসহ নানা সাজসজ্জায় খরচ করা হয় অঢেল অর্থ। বর্তমান বাজারে শুধু কনের খরচই হয় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা, যা একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় রকমের খরচ। এ ছাড়া কনের খরচের পাশাপাশি বরের শেরোয়ানি-স্যুট থেকে শুরু করে অন্যান্য খরচের পেছনে কম করে হলেও দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ হয়। শুধু বর-কনের পোশাক ও সাজসজ্জার খরচই যেখানে সাত-আট লাখ টাকা, সেখানে বর্তমান বাজারে আয়োজন করে কম খরচে বিয়ে করা এক রকমের অলীক কল্পনা।
বিয়ের বাজার করতে আসা সিনথিয়া বলেন, ২৫ হাজার টাকার নিচে কাতানের ভালো কোনো শাড়ি নেই। বর্তমান সময়ে মেয়েদের বেনারসির থেকে কাতানের শাড়ি বেশি পছন্দের। এক শাড়িতেই যদি এত টাকা যায়, তাহলে বাকি কেনাকাটার জন্য তো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিয়ে করতে হবে। আরেক ক্রেতা সাকিব জানান, বিয়েতে শুধু নিজের জন্য নয়, কনের জন্যও বিভিন্ন জিনিস কিনতে হয়। মেয়েদের শাড়ি, মেকআপ, গহনাসহ প্রতিটি জিনিসের দাম বেশি। পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনেরও পোশাক-পরিচ্ছদ কিনে দিতে হয়। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের অবস্থা বেগতিক।
এদিকে মিরপুর বেনারসি পল্লির বিভিন্ন দোকানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ভালো মানের বেনারসির দাম ১০ হাজার থেকে শুরু হলেও পছন্দসই বেনারসির দাম অনেক ক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকা এবং ক্ষেত্রবিশেষে লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। আবার বিভিন্ন মানের লেহেঙ্গার দাম ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত হয়। পোশাক ছাড়াও বিয়েতে গেট ও স্টেজ সাজানোসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ রয়েছে। যেগুলোও বেশ ব্যয়বহুল। বর্তমান প্রজন্মের বিয়ে মানেই ফটোগ্রাফি আর সিনেমাটোগ্রাফির আলোকশিল্প। দক্ষ ফটোগ্রাফের হাতে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এ মুহূর্তটি ধরে রাখতে চাইলে খরচ পড়ে ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।
এ ব্যাপারে পেশাদার ওয়েডিং ফটোগ্রাফার রাকিব হোসেন বলেন, ফটোগ্রাফির নানা ধরনের প্যাকেজ আছে। অনেকে কমে ফটোগ্রাফি করতে চাইলেও বিয়েতে ভালো মানের ফটোগ্রাফার ও ভালো সিনেমাটোগ্রাফারের খরচ ৫০ হাজারের ওপরে ধরাই শ্রেয়। এ ছাড়া ছবির পরিমাণ, ভিডিওর সাইজের ওপর এ খরচ অনেকখানি নির্ভর করে। অনেকে আবার ওয়েডিং প্ল্যানার রাখেন। সেখানে খরচ বেড়ে দেড় লাখ টাকার ওপর উঠে যায়। একেবারে সাদামাটা ধাঁচের ফটোগ্রাফির জন্যও কম করে হলে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেয়া হয় বলে জানান তিনি।
কনভেনশন হলের খরচ
শীত মৌসুমে বিয়ের অনুষ্ঠান বেড়ে যাওয়ায় কমিউনিটি সেন্টার বা কনভেনশন হল ভাড়া পেতে বিপাকে পড়তে হচ্ছে অনেককে। পাশাপাশি বেড়ে গেছে হলের ভাড়াও। সম্প্রতি বিয়ে করা সাব্বির হোসেন জানান, গত ডিসেম্বরে বিয়ে করেছেন তিনি। তবে হল ভাড়া করেছেন নভেম্বরেই। তবু গুনতে হয়েছে বাড়তি টাকা।
ভালো এলাকায় একটি কনভেনশন সেন্টারের ভাড়া ৫০ হাজারের নিচে পাওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে সাব্বির বলেন, ৫০ হাজার টাকায় যেসব কনভেনশন সেন্টার পাওয়া যায়, সেখানে ২০০-র বেশি মানুষের ব্যবস্থা করা যায় না। কেউ যদি ৩০০-৪০০ মানুষের জন্য কনভেশন সেন্টার ভাড়া করতে যান, তাহলে ১ লাখ টাকাই পড়বে সেন্টারের ন্যূনতম ভাড়া।সদ্য বিয়ে করা রায়হান জানান, বিয়েতে মানুষের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা হয়। তবে হলগুলোর ভাড়া বর্তমানে এতটাই বেড়ে গেছে যে, বাধ্য হয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান নিজের বাড়ির ছাদে আয়োজন করেছি।
কমিউনিটি সেন্টার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত এক দশকে ঢাকার কনভেনশন সেন্টারগুলোর ভাড়া বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। ঢাকার মধ্যে ২০০-৩০০ মানুষের কনভেনশন সেন্টারের ভাড়া শুরু হয় ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায়। মান অনুযায়ী অনেক কনভেনশন সেন্টারের ভাড়া ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা। উচ্চবিত্তরা মূলত পাঁচতারকা যেসব কনভেশন সেন্টার বা বলরুমে বিয়ে করে, সেসবের ভাড়া ক্ষেত্রবিশেষে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
আদর-আপ্যায়ন
বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে খাবার নিয়ে আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে একধরনের প্রতিযোগী মনোভাব লক্ষ করা যায়। একজন আরেকজনের থেকে বেশি ভালো খাবার পরিবেশন করতে চান। আর এ জন্য এখন বেশিরভাগ বিয়ের অনুষ্ঠানেই কাচ্চি বিয়িয়ানি, রোস্ট, বোরহানি, কাবাবসহ বিভিন্ন চাইনিজ আইটেম আয়োজন করতে দেখা যায়।
সম্প্রতি ছেলের বিয়ে দিয়েছেন স্কুল শিক্ষক রহমত আলী। বিয়ের সাজসজ্জা ও গহনা ছাড়াও তার খাওয়া-দাওয়া বাবদ খরচ হয়েছে ২ লাখ টাকার ওপরে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাজারে খাসি ও মুরগির মাংসের বাজার অনেক চড়া। পাশাপাশি বাড়ছে পেঁয়াজ, আদা, রসুন ও চালের দাম। এতে বেড়ে গেছে খাওয়ার খরচও।
শুক্রবার (২৬ জানুয়ারি) বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ২১০ টাকা ও সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায়। আর প্রতিকেজি খাসির মাংস ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা ও গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়।
এ ছাড়া জাতভেদে প্রতিকেজি পেঁয়াজ ৯০ থেকে ১৩০ টাকা, রসুন ২০০ থেকে ২৮০ টাকা ও আদা বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৪০ টাকায়। আর মানভেদে প্রতিকেজি চিনিগুড়া চাল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা ও বাসমতি চাল বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, বাজারে প্রায় প্রতিটি জিনিসেরই দাম বাড়তি। যার প্রভাব পড়েছে বিয়ের বাজারেও। এক প্রকার বাধ্য হয়েই খাদ্যপণ্য কিনছেন ক্রেতারা।
কিউএনবি/আয়শা/২৬ জানুয়ারী ২০২৪,/সন্ধ্যা ৭:২৮