শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:০৪ পূর্বাহ্ন

জাতীয় ‘গ্যাস সংকটের সহসা সমাধান নেই’

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ২ অক্টোবর, ২০২২
  • ৩৪ Time View

ডেস্কনিউজঃ বাংলাদেশ এখন গ্যাস সংকটে ধুকছে। এর প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ এবং গৃহস্থালি খাতে। গ্যাস সংকটের কারণে একদিকে যেমন ভুগছেন সাধারণ মানুষ অপরদিকে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন। দেশের রপ্তানি আয়ের মেরুদণ্ড পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানান, এই খাতে গ্যাস সংকটের কারণে শতকরা ২০-৩০ ভাগ উৎপাদন কমেছে। তাদের অভিযোগ, সরকারের কাছ থেকে সংকট সমাধানের কোনো আভাস মিলছে না।

আর এই খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট সমাধানে সরকারের যে উদ্যোগ তাতে আশু সংকট কাটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

দেশে এখন উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত আছে ১০ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাসের প্রতিদিনের মোট চাহিদা তিন হাজার আটশ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ আছে দুই হাজার আটশ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

এরমধ্যে বিদ্যুৎ খাতের চাহিদা দুই হাজার দুইশ ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ আছে এক হাজার ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে গত দুই-একদিনে সরবরাহের পরিমাণ নয়শ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে গেছে।

সার কারখানায় গ্যাসের দৈনিক চাহিদা তিনশ ২০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ করা হয় একশ ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। এলএনজির চাহিদা আটশ ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ আছে চারশ ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। গৃহস্থালির রান্নার কাজে ছয়শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও এখন সরবরাহ করা যাচ্ছে সর্বোচ্চ চারশ মিলিয়ন ঘনফুট।

দেশে দুইভাবে গ্যাসের চাহিদা মেটানো হয়। দেশীয় উৎপাদন দিয়ে এবং আমদানি করে। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় দুই হাজার তিনশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। আর আমদানি করা হয় সাতশ থেকে সাতশ ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এলএনজি আমদানি করা হয় চারশ ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় পাঁচশ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি নিয়মিতভাবে কেনা হচ্ছে। স্পট মার্কেট থেকে আনা হতো দুইশ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে গত জুলাই মাস থেকে উচ্চমূল্যের কারণে কেনা বন্ধ রাখা হয়েছে। এই ঘাটতি মেটানোর জন্য দেশীয় কূপগুলো থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে বলে জানায় পেট্রোবাংলা।

সুতরাং গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে হলে হয় উৎপাদন বাড়াতে হবে অথবা আমদানি বাড়াতে হবে। আমদানি বাড়ানো কঠিন কারণ বাংলাদেশ এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলার সংকটে আছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে গ্যাসের প্রকৃত মজুত কত, নতুন গ্যাস কূপ খনন কবে সম্ভব হবে তা নিশ্চিত নয়। এই কাজে রাষ্ট্রায়াত্ব প্রতিষ্ঠান বাপেক্স এবং রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম নিয়োজিত আছে।

গৃহস্থালিতে সংকট

চলমান এই গ্যাস সংকটের কারণে গৃহস্থালির রান্নার কাজে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। ঢাকাসহ সারাদেশেই এই সংকট চলছে।

ঢাকার নারিন্দার বাসিন্দা এম কে জিলানী বলেন, ‘‘গত এক বছর ধরেই আমরা গ্যাস সংকটে আছি। এখন সেটা আরো তীব্র হয়েছে। এখন সারাদিনে সন্ধ্যার পর কয়েক ঘণ্টার জন্য গ্যাস থাকে। অন্য সময় যে গ্যাস থাকে তা দিয়ে চাও বানানো যায় না।’’

তিনি বলেন, ‘‘এখন এক বেলা রান্না করে তিন বেলা খাই। আগে সকালে নাস্তায় রুটি খেতাম এখন পান্তা ভাত খেতে বাধ্য হচ্ছি।”

রামপুরার বাসিন্দা কান্তা আফরোজ বলেন, ‘‘প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে গ্যাস চলে যায়। আসে দুপুরের পরে তিনটার দিকে। তাই সকাল ৯টার মধ্যে নাস্তা এবং দুপুরের খাবার তৈরি করতে না পারলে বিপাকে পড়ে যাই।’’

ঢাকার প্রায় অর্ধেক এলাকায় এই গ্যাস সংকট চলছে। ঢাকার বাইরেও একই অবস্থা। গ্রাহকদের অভিযোগ, ‘‘গ্যাস না থাকলেও বিল পুরোটাই আদায় করা হচ্ছে।’’

দেশের মোট চাহদার শতকরা ১০ ভাগ গৃহস্থালির। আর এই খাতে গ্যাস সংকট চলছে দুই বছর ধরে। প্রথমেই এখানে সরবরাহ কমানো হয়। দেশে এখন গৃহস্থালির কাজে গ্যাস লাইন দেয়া বন্ধ আছে। ফলে এলপি গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে।

শিল্প উৎপাদন কমছে

গ্যাস সংকটে দেশের বড় শিল্প কারখানাগুলোতে কমেছে উৎপাদন। বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাতে গড়ে উৎপাদন কমেছে শতকরা ২০-৩০ ভাগ।

আবার যারা ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট ব্যবহার করছেন তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। বাজার থেকে চড়া দামে জ্বালানি তেল কিনতে হচ্ছে তাদের। উৎপাদন কমে যাওয়া ও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি আয়ে ভাটা পড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, ‘‘আজকে (রবিবার) নিট ওয়্যার খাতে গত মাসে রপ্তানির যে হিসাব বের হয়েছে তাতে রপ্তানি ৬.১ ভাগ কমে গেছে। আগের মাসে রপ্তানি বেড়েছিলো ২৫ শতাংশ। সেই হিসাব করলে আমাদের রপ্তানি কমেছে শতকরা ৩১ ভাগ।”

তিনি বলেন, ‘‘গ্যাস সংকটের কারণে আমার কারখানায় উৎপাদন ৫০ ভাগের নিচে নেমে এসেছে। কারণ গ্যাস না থাকার কারণে ডায়িং ফ্যাক্টরিগুলো সময় মত এবং চাহিদা মত ফেব্রিক সরবরাহ করতে পারছে না। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই এখন তার ক্যাপাসিটির ৫০ ভাগের বেশি উৎপাদন করতে পারছে না।”

তার কথা, ‘‘এতে রপ্তানি যেমন কমছে তেমনি শ্রমিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা ওভারটাইম করতে পারছে না। ফলে তারা বাড়তি আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমরা বার বার সরকারের সঙ্গে এই গ্যাস সমস্যা নিয়ে কথা বলছি । কিন্তু কোনো সমাধানের আশ্বাস পাচ্ছি না।’’

বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, ‘‘গ্যাসের সাথে ডলার সংকট এবং ইউরোপের বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় আমরা সংকটে আছি।’’

তিনি জানান, ‘‘যেসব কারখানা পুরোপুরি গ্যাসের ওপর নির্ভশীল তাদের উৎপাদন কমে গেছে। আর যাদের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট আছে তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। বাজার থেকে উচ্চ মূল্যে জ্বালানি তেল কিনে তাদের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। আর সব মিলিয়ে উৎপাদন কমে যাচ্ছে।’’

‘সংকটের আপাতত সমাধান দেখছি না’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, ‘‘বাংলাদেশে গ্যাস নিয়ে বাস্তবে কোনো বিজ্ঞান ভিত্তিক জরিপই হয়নি। আসলে আমাদের কতটুকু গ্যাস আছে, কী পরিমাণ সম্ভাবনা আছে তা নিয়ে আমাদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে। ফলে আমরা জানি না যে, পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে। সরকারের যে উদ্যোগ তাতে আশু সংকট কাটার কোনো লক্ষণ দেখছি না।’’

‘আওয়ামী লীগই সবসময় দুর্গত মানুষের পাশে থাকে, বিএনপি থাকে না’‘আওয়ামী লীগই সবসময় দুর্গত মানুষের পাশে থাকে, বিএনপি থাকে না’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘এই সংকটের নামে এখন নানা গোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটের কথা বলে একটি গোষ্ঠীকে রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট করতে দেয়া হয়েছে। তারা বসে বসে পয়সা নিচ্ছে। এক টাকার বিদ্যুৎ পাঁচ টাকায় কিনছি। এক টাকা তিন পয়সার গ্যাস এখন আমরা আমদানি করছি ৮৩ টাকায়। একটা কূপ খনন করতে দেশের প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের লাগে ৬০-৭০ কোটি টাকা। অথচ রাশিয়ন গ্যাজপ্রমকে দিয়ে ৬৬টি কূপ খনন করানো হলো প্রতিটি ২৪০ কোটি টাকা দিয়ে। দুর্নীতি করবেন আবার মানুষের দু:খ ঘোঁচাবেন এটা তো হয়না।’’

চেষ্টা করছে পেট্রোবাংলা

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান খান বলেন, ‘‘দেশে গ্যাস সংকটের কারণ সরবরাহ কম। চাহিদা অনুযায়ী আমরা সরবরাহ করতে পারছি না। দেশে উৎপাদনে ঘাটতি আছে আবার স্পট প্রাইস বেড়ে যাওয়ায় আমরা স্পট আমদানিও এখন বন্ধ রেখেছি। আগে যে দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তি ছিলো সেই গ্যাসই আনা হচ্ছে।’’

তার কথা, ‘‘সারাবিশ্বেই জ্বালানির সংকট চলছে। আমরাও তার বাইরে নই। তবে আমরা দেশীয় উৎপাদন এবং আমদানি দুটিই বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি। নতুন কুপ খনন ও গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানের কাজ চলছে।’’তবে কবে নাগাদ এই সংকটের সমাধান হতে পারে তা জানাতে পারেননি তিনি।

কিউএনবি/বিপুল/০২.১০.২০২২/ রাত ১০.০৩

সম্পর্কিত সকল খবর পড়ুন..

আর্কাইভস

December 2022
MTWTFSS
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930 
© All rights reserved © 2022
IT & Technical Supported By:BiswaJit
themesba-lates1749691102