প্রথম মা হওয়া
——————
কদিন আগে কলকাতায় গিয়েছিলাম বিশেষ কাজে। ফিরতি পথে ২২/২৩ বছর বয়সী গর্ভবতী একটি মেয়ে প্লেন থেকে নেমে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে পারছিল না বিধায় মাটিতেই বসে পরার চেষ্টা করছে।পাশে থাকা স্বামীর কোন হুঁশ নেই সে বুঝতেও পারছে না স্ত্রীর ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
তাড়াতাড়ি দৌড়ে কাছে যেয়ে বললাম, দু পায়ে ব্যথা হচ্ছে খুব আমাকে ধরে দাঁড়াবে নাকি প্লেনের সিরিতে খানিকটা সময় বসে থাকবে। কথা বলতে বলতেই বাস চলে এলো, যথারীতি মেয়েটির উঠতে দেরী । আমার পাশে বসা যুবক ছেলেটিকে উঠিয়ে ওকে পাশে বসালাম।সঙ্গে সঙ্গে ও’ আমার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল।ওর মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম ” ক মাস ” । মেয়েটি বলল ৭ মাস। ওর ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে, বোতল দিয়ে পানি খাওয়ালাম। কিন্তু বকাও দিলাম, ”এতো অসুস্থ শরীর নিয়ে কেন এতদূর এসেছ?”
মেয়েটি জানালো শ্বশুর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ি এসেছে যদি মরে যায়। আহাঃ এখন যে কষ্ট পাচ্ছ !
মেয়ের স্বামী আড় চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে । ছেলেটির তাকানো দেখে মনে হল ও’ আমাকে ঠিক পছন্দ করছে না। মনে মনে হাসলাম, আমার আদরটা তো মায়ের আদর, এই আদরের সাথে ওর ঈর্ষা হবে কেন ?
মা’ হওয়া এতো সহজ নয় বাবা সেই কষ্টের কতোটুকু বুঝে ?
অনেকে হয়তো খানিকটা বুঝে অনেকে বুঝেই না।
আমার ছেলে ৮ মাস পেটে থাকা অবস্থায় একা একা ট্রেনে চেপে জামালপুরে গেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কালিন সময়ের মত, কই ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও টিংকু তো আমার সাথে যায়নি কিংবা মানাও করেনি।
আমার শৈশবে গাছে উঠা, খেলাধুলার শরীর শক্ত পোক্ত ছিল, আমি সুস্থ ছিলাম কিন্তু তাতে কি যদি ট্রেনেই বাচ্চা হয়ে যেতো, তখন ?
ওই বয়সে এতো সব বুঝার ক্ষমতা কিংবা অভিজ্ঞতা ছিল না হয়ত দুজনেরই । বিন্দাস ঘুরতাম কোন চিন্তাও নেই। আগের দিন রাতে বাসে করে স্বামীর সাথে চট্টগ্রাম থেকে ফিরে পরদিন সকালে জামালপুর এতো বড় পেট নিয়ে একা একা ট্রেনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার জার্নি।
অবশেষে মা’ হওয়ার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলুফার মেডামের আন্ডারে ভর্তি হলাম।
অপারেশন টেবিলে ইপিডোরাল ইনজেকশন দিয়ে অর্ধেক শরীর অবশ করার সময় ডাক্তার জিজ্ঞেস করছে তুমি কোন ক্লাসে পড় ? আমি বললাম মাস্টার্স পাশ করেছি। ডাক্তার উত্তর করলো দেখে তো মনে হয় মাত্র স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছ, সত্যি বলছ তো। ফান করে হয়ত আমার ভয় কমানোর চেষ্টা করছেন, কারণ সবাই টিংকুর শিক্ষক। একটু পরেই বাচ্চার চিৎকার।বুঝলাম আমার পেটটা এখন কেটে কুটে একাকার, রক্ত ঝরছে অবিরত। ভয়ে চোখ খুলছি না আর।
নার্স তোয়ালে পেঁচিয়ে ছেলেকে কাছে আনলো ।
ছেলেকে দেখে মনে মনে বললাম এতো ছোট বাচ্চা কেমন করে কোলে নিবো ! সাথে সাথে ঘুমে চোখ জড়িয়ে এলো কারণ ব্যথা কমানোর জন্য শরীরে পেথিডিন পুশ করা হয়েছে।
আজ এতো কিছু মনে হওয়ার একটাই কারণ আমার ছেলের জন্মদিন, আমার প্রথম মা’ হওয়া। সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন ও’ যেন সুস্থতা, ভালোবাসা আর আনন্দে জীবন কাটাতে পারে।
আর নতুন বাবাদের বলছি স্ত্রীর দিকে নজর রাখুন কারণ মা’ হওয়া আসলে অনেক কঠিন। কত নারী বাচ্চা হওয়ার আগে-পরে মারা যায় বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় যা হয়তো একটু সচেতন হলেই এড়ানো যেতো।নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নিন, চেক আপ করান।
এই মুহূর্তে গর্ভবতী প্রতিটি নারীর জন্য আমার দোয়া আর ভালোবাসা।সবার মা হওয়া মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন সহজ আর সুন্দর করে দিন।
লেখিকাঃ খুজিস্তা নূর ই নাহরীন নিয়মিত লেখালেখি করেন। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর লেখা ঝড় তুলে। পূর্বপশ্চিমবিডিনিউজ এর সাবেক সম্পাদিকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রী খুজিস্তা নূর ই নাহরীন বর্তমানে মডার্ন সিকিউরিটিজ লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর টাইমলাইন থেকে পোস্টটি সংগৃহিত।
কিউএনবি/বিপুল/ ১৩.০৭.২০২২/ সন্ধ্যা ৭.৪৮