নববর্ষ, হালখাতা এবং মিষ্টির প্যাকেটের সঙ্গে বাংলা ক্যালেন্ডার— এই জুড়ি বোধহয় ভাঙার নয় কখনোই। বাংলার সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠলেও, এই জায়গায় পৌঁছতে ক্যালেন্ডারের চেহারা আর রূপ বদলে গিয়েছে বারবার। এমনকি ইতিহাসে তার তাৎপর্য এবং গুরুত্বও অনেকটাই।
ভারতে বাংলা নববর্ষ পালিত হয়ে আসছে। বাংলা সনের সূত্রপাত যে একজন হিন্দু রাজার হাত ধরে, সেই বক্তব্য নিয়েই জেলায় জেলায় প্রচার শুরু করছে আরএসএস প্রভাবিত ‘বঙ্গীয় সনাতনী সংস্কৃতি পরিষদ’।
কলকাতায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাংস্কৃতিক শাখা আইসিসিআর-এর যে সেন্টারটি রয়েছে, তার মিলনায়তনে এই উপলক্ষে নববর্ষের দিন একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন করেছ ওই সংগঠনটি।
বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ কে প্রতর্বন করছিলেন তা নিয়ে ভারতীয় কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিতর্ক তুললেও বাংলাদেশে গবেষক ও ইতিহাসবিদরা একমত যে এর সূচনা হয়েছিল সম্রাট আকবরের হাতে। তারা বলছেন যে গৌড়ের প্রাচীন হিন্দু রাজা শশাঙ্ক নন, বরং মুঘল সম্রাট আকবরই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করেছিলেন।
আকবরের শাসনের দুই দশক পার হয়ে গেছে তখন। মুঘল বংশের তৃতীয় সম্রাট আকবরের পরিধি বাড়িয়ে চলা সাম্রাজ্য ততদিনে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য। কিন্তু শুধুমাত্র সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং সাম্রাজ্য বিস্তারেই মন ছিল না আকবরের। বরং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই বিস্তীর্ণ সীমাভূমিতে সুশাসনের জন্য দরকার বৌদ্ধিক ভাবে উন্নত হওয়া। এই উন্নতির নিরিখে আকবর হাতিয়ার করলেন তিনটি মূল মন্ত্র: ধর্ম, দর্শন এবং চারুকলা।
মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে (মতান্তরে ১৫৫৬) ফসলি সন বা বঙ্গাব্দ হিসেবে বাংলা সনের প্রবর্তন করেনা । হিজরি চান্দ্রপঞ্জিকা ও সৌর সনের সমন্বয় করে, মূলত কৃষি খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এবং তাঁর সিংহাসন আরোহণের (১৫৫৬ খ্রি.) সময়কাল থেকে গণনার সুবিধার্থে এই নতুন ক্যালেন্ডার চালু করা হয়।
নোবেল জয়ী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর বই, ‘আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’-এ দেখিয়েছেন যে, আকবরের বিভিন্ন ধর্মের প্রতি আগ্রহ কীভাবে তাঁকে বিভিন্ন ধর্মের ক্যালেন্ডারের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। এত রকম ক্যালেন্ডারের ভিড়ে তিনি চেয়েছিলেন একটা এমন ক্যালেন্ডার, যা হবে সহজ, আধুনিক এবং আক্ষরিক অর্থেই সকলের।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার মূলতঃ একটি সাম্প্রদায়িক সরকার। মুসলমানদের ঐতিহাসিক অবদান খর্ব করার উদ্যেশ্যে নতুন নতুন তত্ব নিয়ে হাজির হচ্ছে।
আরএসএস হলো ভারতের একটি অন্যতম প্রধান ডানপন্থী, হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন, যা ১৯২৫ সালে কে. বি. হেডগেওয়ার প্রতিষ্ঠা করেন । এটি সাংস্কৃতিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হিন্দু সমাজ গঠনে কাজ করে এবং ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি-সহ নানা সহযোগী সংগঠন নিয়ে গঠিত। আরএসএস এর মূল উদ্দেশ্য বর্তমানে মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরোধিতা।
এ কারণেই বাংলা সনের প্রবর্তক সম্রাট আকবরের ভূমিকাকে বিনষ্ট করার জন্যে আরএসএস প্রচার চালাচ্ছে যে আকবর নয় বাংলা সোনার প্রবর্তক হিন্দু রাজা শশাঙ্ক।
লেখকঃ লুৎফর রহমান একজন রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক নিউজ মিডিয়ার সম্পাদক ও প্রকাশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র লুৎফর রহমান ৮০ এর দশকের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরতে চারটি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছেন, যা দেশ বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় জীবনের খন্ডচিত্র এঁকে তিনি এখন ব্যাপক পরিচিত পাঠক মহলে। গঠনমূলক ও ইতিবাচক লেখনীতে তিনি এক নতুন মাত্রা সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছেন।
কিউএনবি/বিপুল/১৫.০৪.২০২৬/ বিকাল ৪.২০