মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ০৬:২৯ পূর্বাহ্ন

৫৫ বছর বয়সে ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছেন বেলায়েত

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ২০ মে, ২০২২
  • ১০৫ Time View

ডেস্কনিউজঃ দরিদ্রতা আর বয়স কোনোটাই দাবিয়ে রাখতে পারেনি বেলায়েত শেখকে। প্রথম দুই ছেলেকে বিয়ে করিয়ে মেয়েকে পাত্রস্থ করে নাতনির মুখ দেখেছেন। তৃতীয় সন্তানের সঙ্গে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়েছেন বাপ-বেটা দুজনেই।

আল্লাহর ওপর ভরসা, বুক ভরা স্বপ্ন আর সাহস নিয়ে ফেসবুকের মাধ্যমে সবার কাছে দোয়া চেয়ে ৫৫ বছর বয়সে আগামী ১১ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছেন বেলায়েত শেখ।

সংসারের অস্বচ্ছলতা, দরিদ্রতা আর বাবার অসুস্থতার কারণে ১৯৮৩ সালে লেখাপড়া থেকে ছিটকে গিয়ে সংসারের হাল ধরেছিলেন তিনি। কিন্তু কোনো বাধাই যেন দাবিয়ে রাখতে পারেনি তাকে। সন্তানদের সঙ্গেই শুরু করেন লেখাপড়া।

গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার কেওয়া পশ্চিমখণ্ড গ্রামের মৃত হাসেন আলী শেখ ও জয়গন বিবির ছেলে বেলায়েত শেখ। চলতি বছর তিনি এইচএসসি (ভোকেশনাল) পাস করেন ঢাকা মহানগর কারিগরি কলেজ থেকে। এর আগে ২০১৯ সালে বাসাবোর দারুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা থেকে দাখিল (ভোকেশনাল) পাস করেন।

তার স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনার। সেই লক্ষ্যে সাইফুরস ভার্সিটি কোচিংয়ের মাওনা শাখায় ক্লাস করছেন তিনি। পেশায় তিনি একজন সাংবাদিক। জাতীয় দৈনিক করতোয়ার শ্রীপুর প্রতিনিধি তিনি। এছাড়া জেটিভি অনলাইনের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করছেন।

বেলায়েত শেখের জন্ম ১৯৬৮ সালে। ছোটবেলা থেকেই খুব কাছ থেকে অভাব দেখেছেন। এর মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। অভাবের তাড়নায় ১৯৮৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তার।

বেলায়েত শেখ জানায়, ১৯৮৩ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম তিনি। তখন বাবার অসুস্থতা এবং অভাবের তাড়নায় পরীক্ষা দিতে পারেনি। ফরম ফিলাপের টাকা দিয়ে বাবার চিকিৎসা করাতে হয়েছিল। এরপর ১৯৮৮ সালে পরীক্ষা দেয়ার চেষ্টা বন্যা আর অভাবের কারণে ভেস্তে যায়।

১৯৯০ সালেও পরীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পারিনি। সে সময় মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। মায়ের কথা ভেবে বিয়ে করেন তিনি। বাবার তখনও অভাব ছিল। সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছিল। ২৫-২৬ বছর একাধারে তিনিই সংসার চালিয়েছি। এসএসসি দিতে না পারায় মেকানিক্যাল কোর্স করেছিলেন। মোটর গাড়ির ওয়ার্কশপ ছিল। ওইসব করেই সংসার চালাতে হয়েছে। ভাই-বোনদের পড়াশোনা করানোর দায়িত্ব ছিল তার ঘাড়ে। কিন্তু তারপরও তাদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত না করতে পারার আক্ষেপ রয়ে গেছে। এই সময়ে আর লেখাপড়ারও সুযোগ পাননি।

বেলায়েত শেখের তিন সন্তান। ১৯৯৪ সালে তার প্রথম ছেলের জন্ম। বিরতি দিয়ে সে এখন গাজীপুরের একটি কলেজে অনার্সে পড়ছে। মাওনা চৌরাস্তায় তাকে স্যানিটারির দোকান করে দিয়েছেন। সম্প্রতি তাকে বিয়েও করিয়েছেন। একমাত্র মেয়ের জন্ম ১৯৯৯ সালে। ইচ্ছে ছিল তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন। সেজন্য রাজধানীর নামকরা কলেজে ভর্তিও করিয়েছেন। কিন্তু মেয়ে সেখানে পড়াশোনা না করেই গ্রামে চলে যায়। সেখানে এইচএসসি শেষে একটি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হয়। সে অনার্স সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত পড়েছে। এরপর তার বিয়ে দেন এবং একটি সন্তানের মা হন। ছোট ছেলের জন্ম ২০০৫ সালে। সে এ বছর বেলায়েত শেখের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেছে।

বেলায়েত শেখ বলেন, আমার স্বপ্ন ছিল সন্তানরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। অনেক আশা ছিল তাদের নিয়ে। কিন্তু তিন সন্তানের কেউই তা পূরণ করতে পারেনি। সেই ক্ষোভ থেকে ২০১৯ সালে এসএসসি আর ২০২১ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া উচ্চ শিক্ষা লাভের আশায়।

তিনি বলেন, ভর্তি পরীক্ষার জন্য শুরুর দিকে প্রস্তুতি নেইনি। তবে এইচএসসি পরীক্ষার ফল ভালো হওয়ায় বাড়তি ভালো লাগা কাজ করল। ভাবলাম, আমি চেষ্টা করলে হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারব। আমার স্ত্রী-ছেলে মেয়েরাও আমাকে পড়ালেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। এরপর শ্রীপুরের মাওনায় রাজধানী থেকে পরিচালিত একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছি। আমার তো বাবা নেই, মারও বয়স হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে অভিভাবক হিসেবে কাউকে যাওয়া লাগতে পারে। এসব চিন্তা করে বড় ছেলেকে অভিভাবক দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, বয়স চল্লিশ পার হলে পড়া আর মাথায় ঢোকে না। আমি পড়তে গেলে পড়া সহজে মুখস্থ হয় না, কষ্ট হয়। এজন্য পড়াগুলো আমি বারবার লিখি। লিখতে লিখতে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করি। বাকিটা আল্লাহর দান আর মানুষের দোয়া।

বেলায়েত বলেন, সময় তো কারো জন্য অপেক্ষা করে না। আমার চুল পেকে গেছে। সেজন্য চুলে কালি দিই। বয়স বেশি হলেও নিজেকে মনের দিক থেকে তরুণ ভাবতে পছন্দ করি। ৫৫ বছর বয়সে আগামী ১১ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেব। আল্লাহর কাছে সাহায্য ও সকলের কাছে দোয়া চাই।

সাইফুরস মাওনা শাখার পরিচালক প্রভাষক নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, বেলায়েত শেখ আমাদের শাখায় ভর্তি হবার পর তার শিক্ষার আগ্রহ দেখে অবাক হয়েছি। আমার বিশ্বাস সে ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষায় সফল হবে।

৫৫ বছর বয়সী বেলায়েত শেখের তৃতীয় ছেলের সাথে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং ঢাবিতে ভর্তির জোরালো প্রস্তুতির খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ভাইরাল হয়েছে এবং এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

কিউএনবি/বিপুল/২০.০৫.২০২২ খ্রিস্টাব্দ /সন্ধ্যা ৬.৪০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

March 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit