ডেস্ক নিউজ : এস এম আব্রাহাম লিংকন কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণকারী দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি একুশে পদক পেলেন। এর আগে কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণকারী সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক যিনি প্রথম একুশে পদক পেয়েছিলেন। এস এম আব্রাহাম লিংকন ১৯৬৬ সালের ১৪ নভেম্বর কুড়িগ্রামের জেলা শহরের কৃষ্ণপুর বকসীপাড়া গ্রামে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। জেলা শহরের বেপারিপাড়া গ্রামের অধিবাসী মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক প্রয়াত মহিউদ্দিন আহমদ ও প্রয়াত আমেনা খাতুন দম্পতির সাত ছেলের মধ্যে পঞ্চম হচ্ছেন আব্রাহাম লিংকন।
তিনি ১৯৯১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে অনার্সসহ এলএলবি এবং এলএলএম পাস করেন। তিনি ১৯৮৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) নির্বাচিত সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ছিলেন। এ ছাড়া তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের সদস্য ছিলেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে তিনি ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর থেকে কুড়িগ্রামে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
এ ছাড়াও তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত আছেন। তিনি তার কর্মদক্ষতার গুণে ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা আট বছর কুড়িগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির দুই মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক এবং দুই মেয়াদে সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি বিগত ২০০৭ সাল থেকে অদ্যাবধি কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে কর্মরত। রাজনৈতিক জীবনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সহসাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এস এম আব্রাহাম লিংকন নিঃস্বার্থভাবে সমাজসেবাসহ নানান সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালে কুড়িগ্রাম আইন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। পারিশ্রমিক ও সম্মানী ছাড়াই তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব অদ্যাবধি পালন করে যাচ্ছেন। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত ফেলানী হত্যা মামলার আইনজীবী। মামলা পরিচালনার জন্য তিনি নিযুক্ত হয়ে ফেলানীর পিতা নুর ইসলামের সঙ্গে দুবার ভারতের কুচবিহারের সোনারীতে অবস্থিত বিএসএফ ব্যাটালিয়ন সদর দফতরে স্থাপিত বিএসএফের জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্স কোর্টে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ফেলানী হত্যার ন্যায্যবিচার চেয়ে দায়েরকৃত রিটের হলফনামায় দুজন স্বাক্ষরকারীর মধ্যে তিনি একজন। অন্যজন ফেলানী পিতার নুর ইসলাম।
বাংলাদেশ ও ভারতের ১৬১ ছিটমহল বিনিময়ে স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির উপদেষ্টা ছিলেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ বর্ডার ভিকটিমস রেসকিউ লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স ফোরামের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য দুজন নারী মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক খেতাব পেয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন কুড়িগ্রামের অধিবাসী তারামন বিবি। এই বীর নারীকে পুনর্বাসিত করার জন্য জেলা শহরের লাগোয়া আরাজী পলাশবাড়ী গ্রামে সরকার প্রদত্ত এক একর জমিতে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত ১০ লাখ টাকা দিয়ে বাড়ি করে দেওয়ার জন্য গঠিত কমিটির সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
পাশাপাশি সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী তার মরদেহ কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ চত্বরে সমাহিত করার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিজেও একজন সুলেখক। তার লিখিত নিবন্ধ দেশের প্রথম শ্রেণির দৈনিকগুলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। এ ছাড়া এ পর্যন্ত তার লিখিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ১১টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এস এম আব্রাহাম লিংকন একক প্রচেষ্টায় সবচেয়ে বেশি কৃতিত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় কাজটি করেছেন তা হচ্ছে, উত্তরবঙ্গ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা। বিগত ২০১২ সালে নিজ বাড়িতে জাদুঘরটি গড়ে তোলেন তিনি। বাংলা একাডেমির নতুন সভাপতি সেলিনা হোসেন
স্বনামখ্যাত আব্রাহাম লিংকন মুক্তিযুদ্ধের গবেষণায় মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক দুর্লভ স্মারক সংগ্রহ করেন। এগুলো দিয়ে গড়ে তোলেন জাদুঘরটি। তাই তো জেলা শহরের বেপারিপাড়ায় অবস্থিত তার সুরম্য বাড়িটি এখন দিনে জাদুঘর, রাতে থাকার বাড়ি। দ্বিতল বাড়িটির ড্রয়িং ও ডাইনিংসহ নিচতলার ৩টি এবং দোতলার ৪টি কক্ষের সব কটি এখন স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারকে ঠাসা। এই জাদুঘরটি পরিচালনার কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারী নেই। এস এম আব্রাহাম লিংকন ও তার স্ত্রী নাজমুন নাহার সুইটি জাদুঘরে সংরক্ষিত স্মারকগুলো দর্শকদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান। এখন সপ্তাহে এক দিন শনিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য জাদুঘরটি খোলা রাখা হয়। এদিকে একুশে পদক পাওয়ায় এস এম আব্রাহাম লিংকনকে জেলা প্রশাসন, জেলা জজশিপ, জেলা পুলিশ, জেলা আইনজীবী সমিতি, প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অভিনন্দন জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।