আলমগীর মানিক,রাঙামাটি : রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে চলমান সংকট নিরসনে সরকারি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দীর্ঘ বৈঠক হলেও পর্যটন সড়কের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ প্রত্যাহার নিয়ে সমঝোতা হয়নি দাবি করে সশস্ত্র সন্তু গ্রুপের সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সরকারি পক্ষ নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি; এমন দাবি করে অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেল ৩টার দিকে সাজেকের উজো বাজারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধি দলের এ বৈঠক শুরু হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা আলোচনা শেষে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। তবে আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আশাবাদ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। একটি বিষয়ে আলোচনা বাকি রয়েছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে ওই বিষয়ে আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তাঁর বিশ্বাস, শিগগিরই পর্যটন সড়ক খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।

সোমবার সন্ধ্যায় সাজেকের পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলার পর গণমাধ্যমের কাছে এসব কথা বলেন ওয়াদুদ ভূঁইয়া। তিনি জানান, রাত হয়ে যাওয়ায় এবং এলাকাটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বাকি বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে। তবে সোমবার রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমার পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সশস্ত্র সন্তু গ্রুপের সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সরকারি প্রতিনিধি দল প্রতিশ্রুতি দিতে না পারায় সমঝোতা হয়নি। এ কারণে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে অন্যতম হলো, সাজেক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া। বৈঠকে এ বিষয়ে সরকারি পক্ষ তিন সপ্তাহ সময় চেয়েছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। তবে আন্দোলনকারীরা তাতে রাজি হননি। তাঁদের দাবি, সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের মধ্যে সশস্ত্র সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রয়োজনে সময় বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।
বৈঠকে সাজেকবাসীর পক্ষে নেতৃত্ব দেন সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা। প্রতিনিধি দলে ছিলেন সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা, ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের উষাতন চাকমা, কমিটির জিকো চাকমা এবং সাজেক নারী সমাজের সদস্য সাধনা দেবী চাকমা। সরকারি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ওয়াদুদ ভূঁইয়া। এতে আরও ছিলেন রাঙামাটির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী এবং দুই জেলার পুলিশ সুপার মো. মোর্তজা আলী খান ও মো. আব্দুর রকিব।
এর আগে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের আলোকে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে বৈঠক করেন। এতে বাঘাইছড়ি থানা এবং মাচালং ও কাচালং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির দুই সংসদ সদস্য এবং দুই জেলার প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাজেকের আন্দোলনস্থল পরিদর্শন করেন। তাঁরা স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বাবুধন চাকমা জানিয়েছেন, আলোচনায় কয়েকটি দাবি নিয়ে অগ্রগতি হলেও তাঁদের মূল দাবিগুলোর বিষয়ে সমাধান হয়নি। এ কারণে অবরোধ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের উত্থাপিত পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে; গত ২২ অক্টোবর অবরোধকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি, হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে বাঘাইহাট জোনের উপ-অধিনায়ক মেজর মো. সালমান সিদ্দিক ও মাচালং ক্যাম্পের কমান্ডার ক্যাপ্টেন খন্দকার মেহেদী হাসানকে শাস্তি দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বদলি, ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার।
এ ছাড়া উজো বাজারের ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাটের ক্ষতিপূরণ, আহত নারী-পুরুষের চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ, উজো বাজার থেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যদের প্রত্যাহার এবং সাজেক থেকে সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধ এবং তাঁদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি না চালানোর দাবিও রয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে স্থানীয় সামরিক প্রশাসনের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েও কার্যকর পদক্ষেপ না পাওয়ায় গত ১১ অক্টোবর পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে সেনা কর্তৃপক্ষের অনুরোধে দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হলেও দাবি পূরণ না হওয়ায় ১৫ অক্টোবর থেকে পুনরায় অবরোধ শুরু হয়। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সাময়িক বিরতির পর ২২ অক্টোবর থেকে আবার কর্মসূচি শুরু করেন তাঁরা। অন্যদিকে সরকারি প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আশাবাদ জানানো হয়েছে।
কিউএনবি/আয়শা/২৬ অক্টোবর ২০২৬,/রাত ৯:৩৩