সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪১ অপরাহ্ন

মার্কিন-ইরান দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং কূটনীতির শেষ চাল

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২০ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্য আজ এক মহা সংকটের মুখোমুখি। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিমুখী হুংকার, ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লড়াই পুরো অঞ্চলকে এক অনিশ্চিত গতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। কূটনীতির টেবিলে দৌড়ঝাঁপ চললেও যুদ্ধের দামামা যেন যেকোনো মুহূর্তে সবকিছু গ্রাস করে ফেলার উপক্রম করেছে।

১. মার্কিন সামরিক হুংকার বনাম কূটনৈতিক শেষ চেষ্টা

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। একদিকে ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, প্রয়োজন হলে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আবার শুরু হতে পারে বা বাকি কাজ শেষ করা হতে পারে; অন্যদিকে ট্রাম্প এটাও বলেছেন যে চাইলে তারা এই সংঘাত থেকে সরেও আসতে পারেন।

২. ইসরাইলি নির্বাচন এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

অধ্যাপক মেইর শেইমারের মতো বিশিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বা চাপ মূলত ইসরাইলি ভূ-রাজনৈতিক সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েই পরিচালিত হয়।

৩. সম্ভাব্য হামলার রূপ এবং ট্যাকটিকাল নিউক্লিয়ারের জুজু

যদি নতুন করে হামলা শুরু হয়, তবে তা কেবল সীমিত বিমান হামলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। সাবেক মার্কিন কর্নেল ম্যাক গ্রেগারের মতো বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রথাগত সামরিক উপায়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এমনকি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বা কৌশলগত অস্ত্রের ব্যবহারের কথাও আলোচিত হচ্ছে।

তবে কাউন্টার টেরোরিজমের বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ধ্বংসাত্মক অস্ত্র প্রয়োগ করেও ইরানকে পুরোপুরি দমানো যাবে না; বরং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পুরো অঞ্চলের মার্কিন ও ইসরাইলি স্থাপনা চরম বিপদের মুখে পড়বে।

৪. ইয়েমেনের হুথি ও সৌদি আরব: লোহিত সাগর ও আকাশসীমার নিরাপত্তা সংকট

পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের জলসীমার পাশাপাশি আকাশপথের নিরাপত্তাও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে হুতিদের তৎপরতা এবং ইয়েমেনের তাইজ শহর ঘিরে চলমান সংঘর্ষ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

হুথিদের তরফ থেকে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোকে অনিরাপদ ঘোষণা করার পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিমান সংস্থা ফ্লাইট স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।

অধ্যাপক রবার্ট পেপের মতো বিশিষ্ট পন্ডিতদের সতর্কতা এবং প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রমাণ করে যে, এই সংঘাত কেবল ইরান বা ইসরাইলের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং পুরো উপদ্বীপের অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তুলেছে। অথচ, হুথিদের মূল দাবি—তাদের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং মানবিক ও অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করা—আন্তর্জাতিক মোড়লদের কূটনীতির প্যাঁচে উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

৫. ফিলিস্তিন সংকট ও আরব বিশ্বের নীরবতা

পশ্চিম তীরে ইসরাইলি আগ্রাসন এবং শত শত ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনার বিপরীতে আরব বিশ্বের কার্যকর কোনো প্রতিবাদ বা জোরালো ভূমিকা না থাকা বিশ্ববাসীর মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন ফিলিস্তিনিরা অস্তিত্বের লড়াই লড়ছে, অন্যদিকে পরাশক্তির তাঁবেদারিতে ব্যস্ত আরব শাসকগোষ্ঠীগুলোর নিষ্ক্রিয়তা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও প্রলম্বিত করছে।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্দির মতে, ইরান যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক চাপের মুখেও নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রমাণ করে আসছে এবং নতুন নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষা চালাচ্ছে, তাতে এটি স্পষ্ট যে বলপ্রয়োগ করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আট মাস ধরে চলা এই দীর্ঘ সংঘাতে ইরান যেমন এক ইঞ্চিও মাটি ছাড়েনি, তেমনি আগামী দিনেও এই ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অবসান সহজে হওয়ার নয়। কাতারের মধ্যস্থতা শেষ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি আনতে পারবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আরও বড় কোনো বিধ্বংসী যুদ্ধের দিকে পা বাড়াবে—এখন সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র

 

 

কিউএনবি/আয়শা/২৬ অক্টোবর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৬:৩৩

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit