আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চীনের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। দেশটির সাংহাই ও শেনঝেনে তালিকাভুক্ত শীর্ষ ৩০০ কোম্পানির শেয়ার নিয়ে গঠিত সিএসআই ৩০০ সূচক জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ২০ শতাংশ হারিয়েছে।
বৃহস্পতিবার সূচকটি একপর্যায়ে ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে প্রযুক্তিগতভাবে ‘বিয়ার মার্কেট’ বা দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী বাজারের পর্যায়ে প্রবেশ করে। একই দিনে হংকংয়ে তালিকাভুক্ত চীনা কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও বড় পতন দেখা যায়।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত আশাবাদ কমে যাওয়া, চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগব্যয়ের দুর্বলতা এবং সরকারের বড় ধরনের নতুন প্রণোদনা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা-এই তিনটি বিষয় বাজারে চাপ তৈরি করেছে। কোম্পানিগুলোর মুনাফা বৃদ্ধির গতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
এআই নিয়ে আশাবাদে ভাটা
চীনের প্রযুক্তি খাতে অগ্রগতি এবং এআই শিল্পকে শক্তিশালী করতে বেইজিংয়ের উদ্যোগ চলতি বছরের শুরুতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছিল। এর ফলে প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এআই কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আয়, মুনাফা এবং বাজারমূল্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, সেই সাফল্য থেকে কোম্পানিগুলো কতটা আয় করতে পারছে, সেদিকেও নজর দিচ্ছেন। প্রত্যাশা দ্রুত বাড়লেও মুনাফা সেই অনুপাতে না বাড়লে শেয়ারের দাম সংশোধনের মুখে পড়তে পারে। এআই-সংশ্লিষ্ট শেয়ারে আন্তর্জাতিক বাজারেও বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। চীনের বাজার সেই বৈশ্বিক প্রবণতার প্রভাবের পাশাপাশি নিজস্ব অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি। দীর্ঘস্থায়ী দরপতন হলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নতুন বিনিয়োগের জন্য শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহও কঠিন হতে পারে।
ভোগব্যয়ে দুর্বলতা, অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা
চীনের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পথে থাকলেও সাধারণ মানুষের ব্যয় করার প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। পরিবারগুলোর ব্যয় কম থাকলে খুচরা বিক্রি, ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা এবং ভোক্তানির্ভর ব্যবসার আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তৃতীয় প্রান্তিকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হয়েছে। ফলে সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনাও বজায় রয়েছে। তবে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান ভালো হলেই যে কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ও মুনাফা সমানভাবে বাড়ছে, তা নয়।
বিনিয়োগকারীরা এমন লক্ষণ দেখতে চান, যাতে বোঝা যায় সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়ছে, কোম্পানির আয় শক্তিশালী হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বিস্তৃত ভিত্তি পাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে স্পষ্ট উন্নতি না এলে শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
সরকারি প্রণোদনার আশাও কমছে
চীনের শেয়ারবাজারে আগের উত্থানের পেছনে সরকারের অর্থনৈতিক সহায়তা ও বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ আশা করছিলেন, অর্থনীতিকে চাঙা করতে সরকার বড় আকারের নতুন প্রণোদনা ঘোষণা করবে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত ব্যাপক সহায়তার পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক ও সীমিত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান তুলনামূলক ভালো হওয়ায় বড় ধরনের নতুন প্রণোদনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ভিন্ন হিসাব থাকতে পারে।
চীনা কর্তৃপক্ষ শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপ কমাতে ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সরকারি সহায়তায় সাময়িকভাবে শেয়ারের দাম স্থিতিশীল হলেও দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের জন্য কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধি, ভোক্তাদের ব্যয় এবং ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি প্রয়োজন।
ব্যাটারি নির্মাতা ক্যাটলের মুনাফাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে
চীনের বড় ব্যাটারি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কনটেম্পোরারি অ্যাম্পেরেক্স টেকনোলজি- ক্যাটলের সাম্প্রতিক আর্থিক ফলও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফা বৃদ্ধির হার প্রত্যাশার চেয়ে কম ছিল। এর পর বুধবার প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় ১২ শতাংশ কমে যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নীতিগত সহায়তা কমে আসা এবং মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় কোম্পানিটির ফলাফল বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ক্যাটলের দরপতনের প্রভাব ব্যাটারি, জ্বালানি ধাতু এবং নতুন জ্বালানিনির্ভর কোম্পানির শেয়ারেও পড়েছে। এ ঘটনা চীনের বৃহত্তর করপোরেট খাতের একটি উদ্বেগ তুলে ধরেছে: প্রযুক্তি ও শিল্পে অগ্রগতি থাকলেও তীব্র প্রতিযোগিতা এবং ব্যয়ের চাপের কারণে কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
দরপতন কি বিনিয়োগের সুযোগ?
শেয়ারের দাম ২০ শতাংশ কমে গেলে বাজারকে তুলনামূলক সস্তা মনে হতে পারে। কিন্তু দাম কমলেই কোনো শেয়ার আকর্ষণীয় বিনিয়োগে পরিণত হয় না। কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয়, মুনাফা, পণ্যের চাহিদা এবং অর্থনৈতিক পরিবেশ বিবেচনা করা জরুরি।
এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভিলওয়ারিয়াফিনসার্ভের অংশীদার অভিষেক ভিলওয়ারিয়া বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কোম্পানির আয় এবং সরকারি নীতির প্রত্যাশা পূরণ না হলে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব দ্রুত বদলে যেতে পারে। তাঁর মতে, নির্বাচিত কিছু চীনা শেয়ারের মূল্যায়ন আকর্ষণীয় হতে পারে, তবে শুধু বাজারের দরপতনকে কেনার সংকেত হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
চীনের শেয়ারবাজারে স্থায়ী পুনরুদ্ধারের জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না এলে সাময়িক উত্থান বাজারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা কাটাতে যথেষ্ট হবে না।
সূত্র: এনডিটিভি।
কিউএনবি/অনিমা/২৩ অক্টোবর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:২৮