আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নবনিযুক্ত হোয়াইট হাউস প্রেস সচিব কেটি যাকারিয়া জানিয়েছেন, তিনি ঠিক কতটা নিয়মিত সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন বা কত ঘনঘন প্রেস ব্রিফিং করবেন, তা এখনো অজানা। একই সাথে নিজের আইনি যোগ্যতা ও পেশাগত ইতিহাস নিয়ে একাধিক বিতর্ক ও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাঁকে।
সম্প্রতি ‘দ্য গার্ডিয়ান’-কে দেয়া এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে কেটি যাকারিয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে তাঁর নিয়োগের সংক্ষিপ্ত অথচ নাটকীয় অভিজ্ঞতার বিবরণ দেন। পূর্বসূরি ক্যারোলিন লিভিটের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার এই প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির। গত ৭ই অক্টোবর বুধবার হোয়াইট হাউস থেকে আসা একটি ফোনের মাধ্যমে মাত্র ছয় দিনের এক ঝটিকা সফরে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। যদিও ফোনে কে কথা বলেছিলেন সে বিষয়টি তিনি প্রকাশ করেননি। পরদিন তিনি লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ওয়াশিংটনে পৌঁছান এবং শুক্রবার পেনসাললভানিয়া অ্যাভিনিউতে হোয়াইট হাউস কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে বসেন। সেদিনই তাকে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং তিনি তা গ্রহণ করেন।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে জাকারিয়া বলেন, আমি বাড়ি ফিরে দুটি ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম, আমার সন্তান, স্বামী এবং পোষা কুকুরদের বিদায় জানালাম। এরপর তিনি ওয়াশিংটনে ফিরে এসে সোমবার প্রথম কর্মদিবস শুরু করেন।
তবে যোগদানের দ্বিতীয় দিনেই ব্রিফিং করার অনুরোধ পাওয়ার পর ট্রাম্পের নতুন এই মুখপাত্রের প্রথম প্রেস কনফারেন্স ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। এর পাশাপাশি তার আইনি যোগ্যতা নিয়েও তীব্র প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। গত মঙ্গলবার নিজের আত্মপ্রকাশ পর্বের ব্রিফিং শেষে সাংবাদিকরা যখন জানতে চান তিনি কোন অঙ্গরাজ্যে বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, তখন তিনি জবাব দেন, যখন আমি চীনে স্থানান্তরিত হই। পরবর্তীতে নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি জানান, সাউথ লনে মেরিন ওয়ানের বিকট শব্দের কারণে তিনি প্রশ্নটি ভুল শুনেছিলেন এবং ভেবেছিলেন সাংবাদিক জানতে চেয়েছেন আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি কোথায় ছিলেন। তবে নিউইয়র্ক টাইমসের কাছেও তিনি বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। তার লিঙ্কডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০১১ সালে পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল স্কুল থেকে স্নাতক শেষ করার পর ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি বেইজিংয়ের আইনি প্রতিষ্ঠান ‘ঝং লুন’-এ একজন সহযোগী বা ‘অ্যাসোসিয়েট’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু সম্প্রতি দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক ঘটনার সূত্রে জানায় যে, ল স্কুল থেকে পাস করার পর কেটি জাকারিয়া ক্যালিফোর্নিয়া বার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিলেন। স্টেট বার অব ক্যালিফোর্নিয়া দ্য গার্ডিয়ানকে নিশ্চিত করেছে যে, তার বৈবাহিক নাম কেটি জাকারিয়া কিংবা অনূঢ়া নাম কেটি ব্ল্যাক; কোনো নামেই ক্যালিফোর্নিয়া থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত হওয়ার কোনো রেকর্ড তাদের কাছে নেই। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে একজন অ্যাটর্নি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, তবে আমেরিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে আইন চর্চার লাইসেন্সপ্রাপ্তদের জন্যই কেবল এই উপাধিটি সংরক্ষিত।
বৃহস্পতিবার ডানপন্থী আউটলেট ‘হিউম্যান ইভেন্টস’-এ কনজারভেটিভ ইনফ্লুয়েন্সার জ্যাক পোসোবিকের সাথে অন্য এক সাক্ষাৎকারে জাকারিয়া স্বীকার করেন যে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বার পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, দীর্ঘ এক বছর ধরে দূরত্বের সম্পর্কে থাকার পর চীনে কর্মরত নতুন স্বামীর সাথে যোগ দেওয়ার আনন্দে তিনি বিভ্রান্ত, অভিভূত এবং উত্তেজিত ছিলেন। অন্যদিকে, জাকারিয়ার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে, জাকারিয়া নিজেকে আইনজীবী পরিচয়ে অটল আছেন এবং তার আইনের ডিগ্রি ও আন্তর্জাতিক ট্রানজেকশনাল আইনের অভিজ্ঞতার বিচারে তিনি এটিকে বৈধ উপাধি মনে করেন। অন্য আইন বিশেষজ্ঞ ও অ্যাটর্নিদের সাথে পরামর্শ করেই তিনি এই পরিচয় ব্যবহার করেছেন এবং তিনি কখনো সরাসরি আইনি পরামর্শ দেননি, কেবল আইনি বিশ্লেষণ করেছেন।
তবে দেশটির আইন বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করেন যে, ‘লইয়ার’ এবং ‘অ্যাটর্নি’ শব্দ দুটি মূলত সমার্থক। ইতোমধ্যে গত বুধবার ওয়াশিংটনের অলাভজনক ওয়াচডগ সংস্থা ‘ক্যাম্পেইন ফর অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট বারকে জাকারিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার অনুরোধ জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, জাকারিয়া নিজেকে আইনজীবী হিসেবে প্রচার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং এতে করে অঙ্গরাজ্যের আইন লঙ্ঘিত হয়ে থাকতে পারে।
শুধু বার পরীক্ষা বা আইনি যোগ্যতাই নয়, জাকারিয়ার পেশাগত জীবনের দীর্ঘ বিরতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চীনে সময় কাটানোর পর তার লিঙ্কডইন প্রোফাইলে ১০ বছরের একটি বিশাল শূন্যতা রয়েছে। সাময়িকী ‘ওয়্যার্ড’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ১০ বছর তিনি ‘বিচবডি’ নামক একটি মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠানে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটার হিসেবে কাজ করেছিলেন, যাকে তিনি নিজেই ওয়্যার্ডের কাছে এক ধরণের পিরামিড স্কিম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীতে তিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও বিশেষ প্রেসিডেন্সিয়াল দূত রিচার্ড গ্রেনেল প্রতিষ্ঠিত ‘ফিক্স ক্যালিফোর্নিয়া’ নামক একটি কনজারভেটিভ গ্রুপের ‘সাধারণ পরামর্শক’ হিসেবে কাজ করার দাবি করেন। যদিও জাকারিয়ার এসব দাবিকৃত ভূমিকা ও পদের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দ্য গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে ‘ঝং লুন’ এবং ‘ফিক্স ক্যালিফোর্নিয়া’ উভয়ের সাথেই যোগাযোগ করা হয়েছে।
হিউম্যান ইভেন্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাকারিয়া আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি প্রেস সচিব পদের জন্য লবিং করছেন, এমনটা দেখাতে চাননি। বরং তিনি ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলোর ওপর কড়া নজর রাখতেন এবং এই পদের অডিশন হিসেবে কনজারভেটিভ টকশো বা টিভি চ্যানেলগুলোতে নিয়মিত উপস্থিত হতেন। ট্রাম্প যখন এই পদের জন্য জাকারিয়ার নাম ঘোষণা করেন, তখন তাঁকে মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেই ক্যাম্পেইনের একজন নিবেদিতপ্রাণ ভক্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন যে, তিনি প্রথম থেকেই ট্রাম্পের একজন অনুগত এবং উজ্জ্বল সমর্থক।
ট্রাম্প মিডিয়া গ্রুপের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা এবং পরবর্তীতে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মুখপাত্র হিসেবে স্বল্পমেয়াদী দায়িত্ব পালন করা জাকারিয়ার কাছে হোয়াইট হাউস তাকে কেন এই পদের প্রস্তাব দিয়েছে তা জানতে চাওয়া হলে তিনি সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একই সাথে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর কত ঘনঘন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবেন, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি এই মুহূর্তে অজানা এবং ট্রাম্প নিজেই তার সেরা মুখপাত্র, তিনি কেবল প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ রাখবেন। সবশেষে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমি প্রেসিডেন্টের নেতৃত্ব অনুসরণ করি।
সূত্র: গার্ডিয়ান
কিউএনবি/অনিমা/১৬ অক্টোবর ২০২৬,/সকাল ৯:০১