আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং রাস লাফান জ্বালানি স্থাপনায় ভয়াবহ ক্ষতির জেরে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম প্রধান গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ কাতার।
আজ মঙ্গলবার দোহার শুরা কাউন্সিলের বার্ষিক অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধে দেশের সরকারি রাজস্ব আয় ৪২ শতাংশ কমে গেছে। সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় দেশটির রপ্তানির একটি বড় অংশ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে।
আমির তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, এই সংকট দেশের রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে; সেটাই স্বাভাবিক, আর সেই ধারাবাহিকতায় বছরের প্রথম অর্ধে মোট রাজস্ব আয় ৪২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানিকারক দেশ কাতার এই আঞ্চলিক সংঘাতের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় দেশগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে। ইরানি হামলায় রাস লাফান এলাকাটির চরম ক্ষতি হয়েছে, পাশাপাশি কাতারের এলএনজি জাহাজের একমাত্র সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হওয়ায় দেশটির গ্যাস রপ্তানি আরও বেশি সংকুচিত হয়ে পড়ে।
তবে সাময়িক এই বিশৃঙ্খলা ও বড় ধরনের আর্থিক ধাক্কা সত্ত্বেও কাতার তাদের দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর মহাপরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে আসছে না। শুরা কাউন্সিলে আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি স্পষ্ট ভাষায় নিশ্চিত করেছেন যে, সমস্ত বাধা কাটিয়ে তাদের নর্থ ফিল্ড গ্যাস প্রকল্পের সম্প্রসারণ কাজ নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসারেই এগিয়ে চলেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র নর্থ ফিল্ড, যা পারস্য উপসাগরের নিচ দিয়ে ইরানি এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। সেটির সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে কাতার তাদের বার্ষিক মোট এলএনজি উৎপাদন ক্ষমতা ১৪২ মিলিয়ন টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে এক্সনমোবিলের সাথে যৌথ অংশীদারিত্বে কাতারের চলমান ‘গোল্ডেন পাস এলএনজি’ প্রকল্পেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে বলে আমীর তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন। সাময়িক সংকট সত্ত্বেও বিশ্ব গ্যাস বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতেই এই প্রকল্পগুলোকে কাতার তাদের মূল কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখছে।
এদিকে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস দেশটির জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। মঙ্গলবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, এই বছর কাতারের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ১৫.৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। বিশাল এই রাজস্ব ঘাটতি আবারও প্রমাণ করে দিচ্ছে কাতার সরকার তার রাষ্ট্রীয় রাজস্বের জন্য কতটা এককভাবে জ্বালানি উৎপাদন ও রফতানির ওপর নির্ভরশীল। যদিও বৃহৎ গ্যাস ক্ষেত্র সম্প্রসারণ প্রকল্পের ধারাবাহিকতা দেশটির জন্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখছে, তবে স্বল্পমেয়াদে এই অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ কিংবা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি মূলত জ্বালানি অবকাঠামোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় স্বাভাবিক নৌপথ চালু হওয়ার ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করছে।
সূত্র: টিআরটি
কিউএনবি/অনিমা/১৪ অক্টোবর ২০২৬,/রাত ৪:০১