আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা ডেটা সেন্টার, ইন্টারনেট ক্যাবল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামোয় হামলা চালানো হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি।
তার এই হুঁশিয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত সম্প্রসারিত ডিজিটাল অর্থনীতি এবং ইউরোপ-এশিয়ার ইন্টারনেট সংযোগের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী ইয়েমেনের কিছু ভূখণ্ড গত মাসে ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ক্যাবলগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কা বেড়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও হুতিদের মধ্যে বাব আল-মানদেব প্রণালিসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র লড়াই চলছে। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চলাচল করে বলে ধারণা করা হয়।
এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ চলাকালে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ডেটা সেন্টার এবং মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। তেহরান দাবি করেছিল, ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব হিসেবেই এসব পাল্টা হামলা চালানো হয়েছিল।
গত জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর বড় ধরনের সক্রিয় যুদ্ধ অনেকটাই থেমে গেছে। তবে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের ইন্টারনেট অবকাঠামো আসলে কতটা ঝুঁকিতে? সম্ভাব্য হামলা কীভাবে বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতকে প্রভাবিত করতে পারে?
কেন ঝুঁকিতে ডেটা সেন্টার ও ইন্টারনেট ক্যাবল?
বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তথ্য অল্প কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পথে পরিবাহিত হওয়ায় এসব অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফির হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে ডেটা পরিবহনের সক্ষমতার ৯০ শতাংশের বেশি লোহিত সাগরের তলদেশে থাকা ক্যাবলগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
এসব ক্যাবল বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে লোহিত সাগরে প্রবেশ করেছে। সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে প্রণালিটির প্রস্থ প্রায় ২৬ কিলোমিটার। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথে যোগাযোগের অন্যতম ব্যস্ত রুট এটি।
সমুদ্রতলের ক্যাবল জাহাজের নোঙরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার পরিকল্পিত নাশকতার মাধ্যমেও এগুলো কেটে দেওয়া সম্ভব। যুদ্ধ চলাকালে এসব ক্যাবল মেরামত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। মেরামতকারী জাহাজের চলাচলের অনুমতি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কাজ করার সুযোগ- সবকিছুই তখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, ডেটা সেন্টার হলো বড় আকারের স্থায়ী স্থাপনা, যেখানে ব্যাংকিং অ্যাপ, ক্লাউড কম্পিউটিং, ব্যবসায়িক সফটওয়্যার এবং বিভিন্ন অনলাইন সেবা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সার্ভার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি রাখা হয়।
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল-জাজিরাকে বলেন, একটি স্থাপনার সব সার্ভার ধ্বংস না করেও হামলার মাধ্যমে পুরো কেন্দ্রটিকে অকার্যকর করে দেওয়া সম্ভব।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডেটা সেন্টার সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, শীতলীকরণব্যবস্থা এবং টেলিযোগাযোগ সংযোগ অপরিহার্য। এসবের যেকোনও একটি গুরুতরভাবে ব্যাহত হলে পুরো স্থাপনার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সমুদ্রতলের কেবলগুলোও সার্বক্ষণিকভাবে সুরক্ষিত রাখা কঠিন। একটি গুরুত্বপূর্ণ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে একই সঙ্গে একাধিক দেশের ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাহত হতে পারে।
বারবার হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান ডেটা সেন্টার ও প্রযুক্তি অবকাঠামোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে।
১১ মার্চ আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ‘ইরানের নতুন লক্ষ্যবস্তু’ শিরোনামে একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে গুগল, মাইক্রোসফট এবং ওরাকলের ক্লাউড অবকাঠামোর কথা উল্লেখ করা হয়।
একই মাসে আইআরজিসি টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক পোস্টে ১৭টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল গুগল, মেটা ও অ্যাপল। তালিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এআই প্রতিষ্ঠান জি৪২-এর নামও ছিল।
ক্রিগ বলেন, রেজায়ির হুঁশিয়ারিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করার সক্ষমতা এবং সেখানকার পুরো ডিজিটাল অবকাঠামো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার সক্ষমতা এক বিষয় নয়।
তার মতে, রেজায়ির বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, তিনি শুধু নতুন কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি দেননি; বরং এমন এক ধরনের কৌশলগত অবকাঠামোকে সামনে এনেছেন, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের পরিকল্পনাকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত শক্তির সঙ্গে সংযুক্ত করে।
ক্রিগের বিশ্লেষণ, এই হুমকির মূল উদ্দেশ্য প্রতিরোধমূলক চাপ সৃষ্টি করা। এর লক্ষ্য শুধু ওয়াশিংটন নয়; আবুধাবি, রিয়াদ ও দোহাও। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় সরকারগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কোনও সামরিক অভিযান নিরুৎসাহিত করার জন্য চাপের মুখে ফেলা হতে পারে।
আগেও হামলার শিকার হয়েছে প্রযুক্তি অবকাঠামো
মধ্যপ্রাচ্যের ডেটা সেন্টার ও ইন্টারনেট অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা ক্যাবল ভবিষ্যতের কোনও সম্ভাবনা নয়। এরই মধ্যে এ ধরনের স্থাপনায় হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
মার্চে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের দুটি স্থাপনা সরাসরি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। বাহরাইনে তাদের আরেকটি স্থাপনার কাছে হামলায় অবকাঠামোগত ক্ষতিও হয়েছে।
এডব্লিউএসের এসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সময় আবুধাবি কমার্শিয়াল ব্যাংক জানিয়েছিল, পুরো অঞ্চলে তথ্যপ্রযুক্তিগত বিঘ্নের কারণে তাদের অ্যাপ ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। তবে ব্যাংকটি সরাসরি এই সমস্যার জন্য এডব্লিউএসের ক্ষয়ক্ষতিকে দায়ী করেনি।
গত সেপ্টেম্বরে এডব্লিউএস জানায়, বাহরাইনের কয়েকটি স্থাপনা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি স্থানে তাদের সেবা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এসব ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, সামরিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকলেই বাণিজ্যিক প্রযুক্তি স্থাপনাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ হয়ে যায় না।
ক্রিগের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক বাহিনী আকাশপথে আসা অধিকাংশ হুমকি প্রতিহত করতে পারলেও অল্প কয়েকটি হামলা সফল হলেই অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন দিয়েও শত শত কোটি ডলারের যন্ত্রপাতি থাকা স্থাপনার কার্যক্রম ব্যাহত করা সম্ভব।
সমুদ্রতলের ক্যাবলও আগেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজিরও রয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লোহিত সাগরে তিনটি ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ডেটা সেন্টার ডায়নামিকসের প্রতিবেদনে শিল্পসংশ্লিষ্ট মহলের মূল্যায়নের ভিত্তিতে বলা হয়, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অচল হয়ে পড়া রুবিমার নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজের টেনে নিয়ে যাওয়া নোঙরের আঘাতেই সম্ভবত কেবলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেগুলো মেরামত করতে কয়েক মাস লেগেছিল।
তবে এ ঘটনায় হুতিরা সরাসরি ক্যাবল কাটার চেষ্টা করেছিল- এমন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গোষ্ঠীটি ২০২৪ সালের ক্ষয়ক্ষতির জন্য নিজেদের দায়ও অস্বীকার করেছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের জেদ্দার কাছে আরও দুটি ক্যাবল কেটে যায়। এতে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেটের গতি কমে গিয়েছিল। তবে ক্যাবল দুটি কী কারণে কাটা পড়েছিল, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
এই ঘটনাগুলো দেখায়, সরাসরি সামরিক হামলা ছাড়াও দুর্ঘটনা, জাহাজের নোঙর কিংবা অজ্ঞাত কারণে ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে।
বাব আল-মানদেব ঘিরে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ
হুতিরা সরাসরি সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবল আক্রমণ করেছে- এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে বাব আল-মানদেব প্রণালি ও আশপাশের ভূখণ্ডে তাদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ক্যাবলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হুতিরা মোখা বন্দর এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশের ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর তারা মাইয়ুন দ্বীপেও পৌঁছে যায়। দ্বীপটি প্রণালিকে দুটি অংশে বিভক্ত করেছে।
তবে গত ৫ অক্টোবর ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দাবি করে, তারা মোখা বন্দর এবং প্রণালির কাছে কয়েকটি অবস্থান পুনর্দখল করেছে। হুতিরা এ দাবি অস্বীকার করেছে।
এই এলাকায় সংঘাত অব্যাহত থাকলে সমুদ্রতলের ক্যাবল মেরামত, নতুন ক্যাবল স্থাপন এবং নিরাপদে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
লোহিত সাগরের বিকল্প পথ তৈরি হচ্ছে
লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প স্থলপথ ও নতুন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং আঞ্চলিক সরকারগুলো। তবে এসব বিকল্পের ব্যয় বেশি এবং অনেক প্রকল্প এখনও নির্মাণাধীন।
গত ১০ সেপ্টেম্বর ইরাকের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানায়, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইরাকের ভূখণ্ড হয়ে ইউরোপে ডেটা পরিবহনের জন্য কাতারভিত্তিক ওরেদুর সঙ্গে চুক্তি করেছে বাগদাদ।
ইরাকের সংবাদ সংস্থাকে দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী মোস্তফা জাবার সানাদ জানান, পরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ ক্যাবলটি আল-ফাও থেকে তুরস্কের সীমান্তসংলগ্ন রাবিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
গত ৭ অক্টোবর ওরেদুর আন্তর্জাতিক শাখা ইরাকের আইকিউ নেটওয়ার্কসের কাছ থেকে ফাইবার সংযোগ কেনার বিষয়ে সম্মত হয়। এর মাধ্যমে তুরস্কের দিকে যোগাযোগপথ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন।
মাইক্রোসফটও গত সেপ্টেম্বরে জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সমুদ্রতলের ও স্থলভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে তারা ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করবে।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘রেস্ট অব ওয়ার্ল্ড’ গত ৭ অক্টোবর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের বরাতে জানায়, গুগল ও মেটা ইরাকের মধ্য দিয়ে কিছু ইন্টারনেট ট্রাফিক পাঠানো শুরু করেছে। তবে এ বিষয়ে আল-জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধে প্রতিষ্ঠান দুটি সাড়া দেয়নি।
ক্রিগের মতে, ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে ঝুঁকিমুক্ত করতে হলে একই ভৌগোলিক অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সংযোগ তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও কিছু স্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
তবে এতে একটি জটিলতা রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও কম্পিউটিং অবকাঠামো নিজস্ব সীমানার মধ্যে রাখতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। একদিকে তথ্যের ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, অন্যদিকে অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা- এই দুই লক্ষ্য সব সময় একসঙ্গে অর্জন করা সহজ নয়।
এআই প্রযুক্তির কেন্দ্র হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় প্রভাব
তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর উপসাগরীয় দেশগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জি৪২ ওপেনএআই, এনভিডিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে ‘স্টারগেট ইউএই’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এটি পরিকল্পিত পাঁচ গিগাওয়াট সক্ষমতার একটি বৃহৎ ইউএই-যুক্তরাষ্ট্র এআই ক্যাম্পাসের অংশ।
সৌদি আরবের সরকারি বিনিয়োগ তহবিল পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ২০২৫ সালের মে মাসে ‘হুমেইন’ নামে একটি এআই প্রতিষ্ঠান চালু করে। সৌদি প্রেস এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং আরবি ভাষাভিত্তিক এআই মডেল তৈরির লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে।
কাতারের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্লু আউলের সঙ্গে তিন শ’ কোটি ডলারের ডেটা সেন্টার বিনিয়োগ উদ্যোগে যুক্ত হয়।
এছাড়া মাইক্রোসফট গত সেপ্টেম্বরে জানায়, ২০৩০ সাল পর্যন্ত কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করবে তারা। এ পরিকল্পনায় ‘ডিজিটাল স্থিতিস্থাপকতা’ বা সংকট মোকাবিলায় ডিজিটাল অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বাহরাইনের কিছু স্থাপনায় থাকা তথ্য পুনরুদ্ধারের বিষয়ে এডব্লিউএস জানিয়েছে, তারা সম্ভাব্য সব বিকল্পই চেষ্টা করেছে। তবু কিছু তথ্য ও সেবা পুনরুদ্ধার করা যায়নি।
ক্রিগের মূল্যায়ন, ইরানের হুমকি উপসাগরীয় দেশগুলোর এআই ও প্রযুক্তিকেন্দ্র হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে পুরোপুরি থামিয়ে দেবে না। তবে এর ফলে বিনিয়োগের ব্যয়, অবস্থান নির্বাচন এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অস্থিতিশীল অঞ্চলের মধ্যে স্থিতিশীল বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু যুদ্ধ সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত?
ক্রিগের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ, দেশটির এআই কৌশল মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এতে আমিরাতের প্রযুক্তি অবকাঠামো ইরানের কাছে আরও আকর্ষণীয় লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকায় কাতার রাজনৈতিকভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তবে এর অর্থ এই নয় যে কাতারের অবকাঠামো সম্পূর্ণ নিরাপদ।
ইরানের হুমকির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ক্রিগ বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের উদীয়মান ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইরান এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, যা দেশগুলোর সামুদ্রিক অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে দেখা গেছে। অর্থাৎ, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ও অবকাঠামোকে ভূরাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ারে পরিণত করা।
আঞ্চলিক সংকটের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে
উপসাগরীয় অঞ্চলে ডেটা সেন্টার ও ইন্টারনেট ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ ডেটা পরিবহন এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় একাধিক দেশের ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যবসা, ক্লাউড সেবা এবং ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে।
একই সঙ্গে এআই খাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল বিনিয়োগের ভবিষ্যৎও নিরাপত্তাঝুঁকির হিসাবের ওপর নির্ভর করবে। নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের পাশাপাশি বিকল্প বিদ্যুৎ, একাধিক ইন্টারনেট সংযোগ, ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ব্যাকআপ ব্যবস্থা এবং দ্রুত মেরামতের সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজন বাড়বে।
তবে ইরানের হুমকির অর্থ এই নয় যে পুরো অঞ্চলের ইন্টারনেট অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়া অনিবার্য। বরং বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, অল্প কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা যোগাযোগপথে বিঘ্ন ঘটিয়েও বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি করা সম্ভব।
সুতরাং বলা যায়, উপসাগরীয় অঞ্চলের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ এখন শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করছে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামরিক নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি এবং বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্ষমতা। মধ্যপ্রাচ্যকে এআই ও প্রযুক্তির বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাই অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করাই হয়ে উঠছে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সূত্র: আল-জাজিরা
কিউএনবি/অনিমা/১৪ অক্টোবর ২০২৬,/রাত ৩:৫৯