আন্তর্জাতিক ডেস্ক : একটি বিশেষ ধরনের জিন থেরাপির নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি এর মাধ্যমে অন্ধ ব্যক্তিদের দৃষ্টিশক্তি আংশিকভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে দাবি করেছেন গবেষকরা। নোবেল পুরস্কারবিজয়ী বৈজ্ঞানিক সূত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই চিকিৎসা পদ্ধতিকে বলা হয় ‘অপটোজেনেটিক থেরাপি’। এতে আলোর সাহায্যে (স্নায়ুকোষ নার্ভ সেল) সচল ও অচল করা যায়, যা ২০২৬ সালের ফিজিওলজি বা মেডিসিন বিভাগে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছে।
২০২১ সালে প্রথমবার মাত্র একজন অন্ধ ব্যক্তির চোখে এই চিকিৎসা প্রয়োগ করে তার দৃষ্টিশক্তি আংশিক ফিরিয়ে আনার সাফল্য দেখা যায়। এবার গবেষকরা পূর্বের সেই রোগীসহ মোট ১০ জন ব্যক্তির ওপর পরিচালিত একটি বড় ট্রায়াল বা পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছেন।
গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক এবং ইনস্টিটিউট অব মলিকুলার অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল অফথালমোলজি বাসেল-এর পরিচালক প্রফেসর বোতন্ড রোস্কা জানান, আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অপটোজেনেটিক্সের ধারণাটি শতভাগ কার্যকর ও সঠিক। রোস্কা আরও যোগ করেন, তাদের লক্ষ্য এখন রোগীদের উচ্চমানের (হাই-রেজোলিউশন) দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার দিকে কাজ করা এবং আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
এই ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ১০ জন ব্যক্তির সকলেই ‘রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা’ নামের একটি জটিল চোখের রোগে ভুগছিলেন। এই জেনেটিক ব্যাধিতে সারা বিশ্বে বর্তমানে ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। এই জাতীয় রোগে চোখের রেটিনায় থাকা আলোকসংবেদী কোষগুলো ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তবে রেটিনায় অবস্থিত যে গ্যাংলিওন কোষগুলো মস্তিষ্কে দৃশ্যমান তথ্য পাঠায়, সেগুলোর অবক্ষয় তুলনামূলক অনেক ধীরগতিতে ঘটে।
গবেষণার অপর প্রধান লেখক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ মেডিকেল সেন্টারের ডক্টর হোসে-আলাঁ সাহেল জানান, গ্যাংলিওন কোষগুলো প্রাথমিক ব্যাধি দ্বারা সরাসরি আক্রান্ত হয় না, ফলে এগুলোই এই থেরাপি প্রয়োগের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ও ভালো প্রার্থী হিসেবে কাজ করে।
এই জিন থেরাপিতে রোগীর চোখে একটিমাত্র ইনজেকশন দেওয়া হয়। এই ইনজেকশনে থাকে একটি ক্ষতিকারক নয় এমন কৃত্রিম ভাইরাস, যা বেঁচে থাকা গ্যাংলিওন কোষগুলোর রিং বা বলয়ের মধ্যে একটি আলোকসংবেদী প্রোটিন তৈরির জিনগত নির্দেশাবলী পৌঁছে দেয়। এর ফলে সেই কোষগুলো আলোতে সাড়া দেওয়ার উপযোগী হয়ে ওঠে।
চিকিৎসা শেষে প্রতিটি রোগীকে একটি বিশেষ আলোক-উদ্দীপক গগলস বা চশমা দেওয়া হয়। এই গগলসগুলো আশেপাশের পৃথিবীর ছবি ধারণ করে এবং সেগুলোকে একক তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোক স্পন্দনে বা পালসে রূপান্তর করে। এই আলোক স্পন্দনগুলো আলোকের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠা গ্যাংলিওন কোষগুলোকে সক্রিয় করে তোলে, যার ফলে ব্যবহারকারী একটি একরঙা বা মনোক্রোম ছবি দেখতে পান। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, রোগীর দৃষ্টিশক্তি হারানোর সুনির্দিষ্ট জিনগত কারণ যাই হোক না কেন, প্রযুক্তিটি সার্বজনীনভাবে একইভাবে কার্যকর হয়।
‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন, প্রতিটি রোগীর সবচেয়ে কম দৃষ্টিসম্পন্ন চোখে তারা এই থেরাপি প্রয়োগ করেছিলেন। চিকিৎসা দেওয়ার পর রোগীদের শারীরিক অবস্থা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রায়াল চলাকালীন মাত্র একটি ক্ষেত্রে চোখে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল, তবে তা মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সেরে যায়। শরীরের অন্যান্য অংশে এই থেরাপির কোনো নেতিবাচক বা ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। চিকিৎসাপ্রাপ্ত ১০ জনের মধ্যে ৬ জন রোগীর ক্ষেত্রেই চিকিৎসার পর আলোর প্রতি সংবেদনশীলতায় চিকিৎসাগতভাবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে।
শুধু তাই নয়, জিন থেরাপি গ্রহণ ও বিশেষ গগলস ব্যবহারের পর বেশ কয়েকজন রোগী বেশ কিছু দৈনন্দিন কাজে উল্লেখযোগ্য পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। যেমন, একটি নোটবুক শনাক্ত করা, নির্দিষ্ট স্থানে রাখা নোটবুকটি খুঁজে বের করা এবং হাত দিয়ে স্পর্শ করা, ঘরের দরজার অবস্থান নির্ধারণ করা এমনকি মেঝের লাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো কাজগুলো তারা সফলভাবে করতে পেরেছেন। গবেষক দলটি পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, যেসব রোগী গগলস ব্যবহারে বেশি সময় ধরে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, তারা এই ধরনের বিভিন্ন কাজ অনুশীলনে তুলনামূলক ভালো ফল দেখিয়েছেন।
অবশ্য গবেষকরা এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও স্পষ্ট করেছেন। রোস্কা জানান, রোগীরা বিভিন্ন বস্তুর উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারলেও তারা এখনও মানুষের মুখমণ্ডল চিনতে পারেন না। গবেষকদের মতে, চিকিৎসাপ্রাপ্ত গ্যাংলিওন কোষগুলো রেটিনার ফোবিয়ার (চোখের যে অংশটি স্পষ্ট কেন্দ্রীয় দৃষ্টির জন্য দায়ী) চারপাশে একটি রিং বা বলয়ের মতো সাজানো থাকার কারণেই মূলত এই সীমাবদ্ধতা দেখা যায়।
গবেষণায় সরাসরি যুক্ত না থাকলেও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যায়ের ভিজ্যুয়াল নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক মার্ক হ্যাঙ্কিন্স এই ট্রায়ালকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই গবেষণাটি চিকিৎসার নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি যাদের এখনও কিছু অবশিষ্টাংশ দৃষ্টিশক্তি রয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি প্রয়োগের পথ উন্মুক্ত করেছে।
হ্যাঙ্কিন্স মন্তব্য করেন, আমরা একজন রোগী থেকে এখন ১০ জন রোগীর ট্রায়ালে পৌঁছাতে পেরেছি। রোগীদের আলোর প্রতি সংবেদনশীলতায় ব্যাপক উন্নতি দেখা গেছে এবং আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি যে এই চিকিৎসার মাধ্যমে অর্জিত আংশিক দৃষ্টিশক্তি ও আলোকসংবেদনশীলতা দীর্ঘ চার থেকে পাঁচ বছর ধরে স্থিতিশীল থাকে। এগুলো হয়তো ছোট ছোট পদক্ষেপ, তবে ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কিউএনবি/অনিমা/০৯ অক্টোবর ২০২৬,/দুপুর ১২:০৩