ডেস্ক নিউজ : স্বামী মারা গেছেন ৩০ বছর আগে। তখন ঘরে ছোট ছোট দুই মেয়ে ও এক ছেলে। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া আর সংসার চালানোর চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন তছিরন বেগম। সেই থেকে শুরু তার জীবনসংগ্রাম। গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে দেশি হাঁস-মুরগির ডিম সংগ্রহ করে শহরে বিক্রি করা শুরু করেন। দেখতে দেখতে কেটে গেছে ৩০ বছর। বয়স এখন আনুমানিক ৬৫ বছর। তবুও থামেনি তাঁর ডিম বিক্রির পথচলা।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মীরবাগ মহেশা গ্রামের বাসিন্দা তছিরন বেগম। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ঘুরে বাড়ি বাড়ি ডিম সংগ্রহ করেন। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন পায়ে হেঁটে রংপুর শহরে আসেন। এরপর শহরের বিভিন্ন মহল্লায় ঘুরে সেসব ডিম বিক্রি করেন। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে ডিমের বাজার। একসময় দেশি হাঁস-মুরগির ডিমের চাহিদা থাকলেও এখন সেই জায়গা দখল করেছে খামারের ডিম। ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে দেশি ডিম। কিন্তু ডিমের ব্যবসা ছাড়েননি তছিরন।
বুধবার নগরীর কামাল কাছনা এলাকায় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। সেদিন তাঁর সঙ্গে ছিল পাঁচ হালি হাঁসের ডিম ও সাত হালি মুরগির ডিম- মোট ১২ হালি। সব ডিম বিক্রি করেও ১০০ টাকা লাভ হবে না বলে জানান তিনি। ডিম বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। তাই কখনো কখনো গ্রামের কৃষকদের জমি থেকে শাক তুলে দেন তছিরন। বিনিময়ে টাকা নয়, কৃষকদের কাছ থেকে পান চাল। সেই চাল দিয়েই মেটান ক্ষুধা।
তছিরনের তিন ছেলে-মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তাদেরও সংসার হয়েছে, সন্তান হয়েছে। নিজেদের সংসার চালাতেই তাদের কষ্ট হয়। ফলে মাকে সহায়তা করার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই তাদের। তাই একাই জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন তছিরন। অন্যের জমিতে একটি ঘর তুলে থাকেন তিনি। তবে জমির মালিক জায়গাটি ছেড়ে দিতে বলেছেন। সেখান থেকে উচ্ছেদ হতে হলে কোথায় গিয়ে থাকবেন—এ চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছেন তিনি।
তারপরও জীবনসংগ্রামে হার মানেননি তছিরন। প্রতিদিনই বেঁচে থাকার তাগিদে পথে নামেন। বয়সের ভার আর অভাব-অনটনের মধ্যেও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সরকারি সহায়তা বলতে তার একটি বিধবা ভাতার কার্ড রয়েছে। তবে কয়েক মাস ধরে সেই কার্ডের ভাতাও বন্ধ রয়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তছিরন বেগম বলেন, ‘আমি খুব দুঃখী। কষ্টে আছি। তবে কারও কাছে হাত পাততে চাই না।’ ৩০ বছর ধরে ডিম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা তছিরনের এখন একটাই চাওয়া- বেঁচে থাকার মতো একটু নিরাপদ আশ্রয় আর নিয়মিত সরকারি সহায়তা।
কিউএনবি/অনিমা/৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/বিকাল ৩:৪৭