আন্তর্জাতিক ডেস্ক : নয়াদিল্লিতে তিন দিনের ভারত সফরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে নানা আলোচনা পুতিনের। তবে পুতিনের এই সফরের রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়েছে তাঁর যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ বিমানও। অত্যন্ত সুরক্ষিত এই বিমানকে প্রায়ই ‘ফ্লাইং ক্রেমলিন’ বা ‘ডুমসডে প্লেন’ নামে অভিহিত করা হয়।
শুক্রবার ভোরে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে নয়াদিল্লিতে পৌঁছান রুশ প্রেসিডেন্ট। পুতিনের সফরকে ঘিরে ভারতের রাজধানীতে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কিন্তু তাঁর সফরের নিরাপত্তার প্রথম স্তর শুরু হয়েছে আকাশপথেই। পুতিন যে বহরে ভ্রমণ করেন, সেখানে একই ধরনের দুটি বিমান একসঙ্গে উড্ডয়ন করতে পারে। কোন বিমানে প্রেসিডেন্ট রয়েছেন, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। ফলে সম্ভাব্য হামলা বা নাশকতার ক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
পুতিনের ব্যবহৃত এই বিশেষ বিমানটি রাশিয়ায় তৈরি ইলিউশিন আইএল-৯৬-৩০০পিইউ-এর অত্যন্ত পরিবর্তিত সংস্করণ। সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানের মতো দেখতে হলেও এর ভেতরের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিমানটিকে শুধু প্রেসিডেন্টের যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে নয়, প্রয়োজনে একটি উড়ন্ত কমান্ড সেন্টার হিসেবেও ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।
আইএল-৯৬ সিরিজের এই বিমানটির মূল নকশার গোড়াপত্তন সোভিয়েত যুগে, ১৯৮০-এর দশকে। দীর্ঘপাল্লার চার ইঞ্জিনের এই বিমানটি মূলত রাশিয়ার ইলিউশিন ডিজাইন ব্যুরোর তৈরি। প্রেসিডেন্টের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ সংস্করণে সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানের তুলনায় যুক্ত হয়েছে বিপুল পরিমাণ যোগাযোগ ও নিরাপত্তা প্রযুক্তি।
বিমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। জরুরি পরিস্থিতিতে রুশ প্রেসিডেন্ট যেন বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে সামরিক, গোয়েন্দা ও সরকারি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারেন, সে জন্য এতে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ প্রযুক্তি রয়েছে। স্যাটেলাইট সংযোগ, সুরক্ষিত রেডিও এবং তথ্য আদান-প্রদানের বিশেষ ব্যবস্থা বিমানটিকে কার্যত একটি মোবাইল কমান্ড সেন্টারে পরিণত করেছে।
কোনো বড় ধরনের জাতীয় সংকট বা সামরিক জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের মাটিতে থাকা কমান্ড কাঠামোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও প্রেসিডেন্ট যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারেন, সেই ধারণাকে মাথায় রেখেই এ ধরনের বিমান তৈরি করা হয়েছে। এ কারণেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিমানটির সঙ্গে ‘ডুমসডে প্লেন’ নামটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। নামটি মূলত এমন একটি বিমানের ধারণাকে বোঝায়, যা ভয়াবহ সংকট বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে নিরাপদ রেখে কমান্ড ও যোগাযোগ চালু রাখতে সক্ষম।
বিমানটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইলেকট্রনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এতে রাডার জ্যামিংয়ের মতো প্রযুক্তি রয়েছে। এর ফলে বিমানটিকে শনাক্ত বা লক্ষ্যবস্তু করা কঠিন করে তোলার সক্ষমতা বাড়ে। একই সঙ্গে এতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা রয়েছে, যা সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
পুতিনের এই বিমান অবশ্য কেবল নিরাপত্তা ও সামরিক যোগাযোগের জন্য তৈরি নয়। এর ভেতরে রয়েছে প্রেসিডেন্টের জন্য অত্যন্ত বিলাসবহুল ব্যক্তিগত পরিসরও। ব্যক্তিগত শয়নকক্ষ, বিলাসবহুল বাথরুম, রান্নাঘর, খাবারের জায়গা এবং বড় আকারের সম্মেলনকক্ষ রয়েছে বিমানের অভ্যন্তরে। ফলে দীর্ঘ সময় আকাশে থাকার সময়ও প্রেসিডেন্টের কাজ চালিয়ে যাওয়া এবং বৈঠক করার সুযোগ থাকে।
বিমানের সম্মেলনকক্ষটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্টের সফর অনেক সময়ই কূটনৈতিক বৈঠক, সরকারি আলোচনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাই বিমানের ভেতরেই এমন একটি জায়গা রাখা হয়েছে, যেখানে প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করা যায়। বোর্ডরুম ধরনের আসন বিন্যাস সেই প্রয়োজনের কথাই তুলে ধরে।
বিলাসিতার দিক থেকেও বিমানটি সাধারণ প্রেসিডেনশিয়াল পরিবহন ব্যবস্থার তুলনায় আলাদা। অভ্যন্তরে রয়েছে উন্নতমানের কাঠের কাজ, প্রিমিয়াম চামড়া ও অন্যান্য উচ্চমানের উপকরণ। এমনকি কিছু অংশে সোনার প্রলেপ দেওয়া ফিটিংস ব্যবহারের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক হওয়ার পাশাপাশি বিমানটি রুশ প্রেসিডেন্টের জন্য একটি চলমান বিলাসবহুল কার্যালয় হিসেবেও কাজ করে।
বিমানটির আকারও উল্লেখযোগ্য। আইএল-৯৬-৩০০ প্ল্যাটফর্মের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৫ দশমিক ৩৫ মিটার এবং ডানার বিস্তার প্রায় ৬০ দশমিক ১২ মিটার। এতে ব্যবহৃত অ্যাভিয়াডভিগাতেল পিএস-৯০এ টার্বোফ্যান ইঞ্জিন বিমানটিকে দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার সক্ষমতা দেয়। একবারে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে সক্ষম হওয়ায় দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সফরের ক্ষেত্রে বারবার জ্বালানি নেওয়ার প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কমে যায়।
রাশিয়ার স্পেশাল ফ্লাইট স্কোয়াড্রন এই বিমান পরিচালনা করে। প্রেসিডেন্ট ও রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের সরকারি বিদেশ সফরের জন্য এই বিশেষ বিমানবহর ব্যবহৃত হয়। পুতিনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর। একই ধরনের দুটি বিমান একসঙ্গে উড়িয়ে নেওয়ার কৌশলটি তারই অংশ। দুটি বিমান দেখতে একই হওয়ায় বাইরে থেকে কোনটিতে প্রেসিডেন্ট রয়েছেন, তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুতিনের বিদেশ সফরে নতুন কিছু নয়। রুশ প্রেসিডেন্ট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফরের সময় তাঁর বিমানবহরকে ঘিরে একই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষেত্রে আকাশপথে সম্ভাব্য হুমকি, নজরদারি কিংবা হামলার ঝুঁকি কমানোর জন্য এমন কৌশল গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
ভারত সফরের ক্ষেত্রেও পুতিনকে ঘিরে নিরাপত্তা তাই শুধু নয়াদিল্লির মাটিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তাঁর ব্যবহৃত বিমান, যাত্রাপথ এবং সফরসূচির নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পুতিন বিশ্বের অন্যতম কঠোরভাবে সুরক্ষিত রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ায় তাঁর বিদেশ সফরের প্রতিটি ধাপেই নিরাপত্তা পরিকল্পনার একাধিক স্তর থাকে।
সূত্র: এনডিটিভি
কিউএনবি/অনিমা/১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ১০:৫০