আন্তর্জাতিক ডেস্ক : নরওয়ের রাজা হারাল্ড পঞ্চম ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন। অসলো রাজপ্রাসাদ জানিয়েছে, শুক্রবার (২৮ আগষ্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে রাজধানী অসলোর জাতীয় হাসপাতালে শান্তিপূর্ণভাবে তার মৃত্যু হয়।
বিরল রক্তরোগ ‘হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়ায়’ আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন রাজা হারাল্ড। গত ১৭ আগস্ট তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এরপর তার ছেলে হাকন রিজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। রিজেন্ট হলো, রাজা বা রানির অনুপস্থিতি, অসুস্থতায় কিংবা তারা বয়সে ছোট (নাবালক) হওয়ার কারণে সাময়িকভাবে কোনো দেশ বা রাজ্য শাসন করেন।
রাজা হারাল্ড পঞ্চম ৩৫ বছর নরওয়ের সিংহাসনে ছিলেন। তিনি ছিলেন নরওয়েতে জন্ম নেওয়া ১৪ শতকের পর প্রথম রাজা। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে হাকন নতুন রাজা হবেন। প্রায় ৫৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে রাজা হারাল্ডের স্ত্রী রানি সোনিয়া, মেয়ে প্রিন্সেস মার্থা লুইস, ছেলে নতুন রাজা হাকন এবং ছয় নাতি-নাতনি রয়েছেন।
১৯৩৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অসলোর কাছে স্কাগুমে জন্মগ্রহণ করেন রাজা হারাল্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি নরওয়ে আক্রমণ করলে তিনি মায়ের সঙ্গে দেশ ছেড়ে সুইডেন ও পরে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। যুদ্ধ শেষে নরওয়েতে ফিরে পড়াশোনা ও সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ করেন।
১৯৫৭ সালে ক্রাউন প্রিন্স হন হারাল্ড। ১৯৬৮ সালে ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে সোনিয়া হারাল্ডসেনকে বিয়ে করেন তিনি। ১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি বাবা রাজা ওলাভ পঞ্চমের মৃত্যুর পর নরওয়ের সিংহাসনে বসেন হারাল্ড। রাজা হারাল্ড ছিলেন নরওয়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সম্মানিত একজন শাসক। তিনি রাজপরিবারের বেশ কিছু পুরোনো রীতি পরিবর্তন করে রাজতন্ত্রকে আরো আধুনিক ও সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসেন। একজন সাধারণ পরিবারের মেয়ে সোনিয়াকে বিয়ে করে তিনি রাজপরিবারের প্রচলিত রীতিতেও বড় পরিবর্তন আনেন।
২০১১ সালে নরওয়েতে সন্ত্রাসী হামলার পর দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তার দেওয়া বক্তব্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। ধর্ম, জাতিগত পরিচয় ও যৌন বৈচিত্র্যের পক্ষেও তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। রাজা হারাল্ড খেলাধুলা ও পরিবেশ রক্ষায়ও সক্রিয় ছিলেন। তিনি ডাব্লিউডাব্লিউএফ-এর নরওয়ে শাখার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং দীর্ঘদিন সভাপতি ছিলেন। দক্ষ নাবিক হিসেবে তিনবার অলিম্পিকে নরওয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন।
২০০১ সালে ছেলে হাকনের স্ত্রী মেটে-মারিতের আগের সম্পর্কের সন্তান মারিয়ুসকে রাজপরিবার আপন করে নেয়। তবে তিনি রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন না। রাজপরিবারের নানা বিতর্কিত বিষয়েও হারাল্ড কঠোর সিদ্ধান্তের বদলে আলোচনা ও সমঝোতাকে গুরুত্ব দিতেন। স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ায় ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে তিনি জনসম্মুখে উপস্থিতি কমিয়ে দেন।
এ বছর নরওয়ের রাজপরিবার নানা স্বাস্থ্য সমস্যা ও বিতর্কের মুখে পড়েছে। হাকনের স্ত্রী মেটে-মারিতের ছেলে মারিয়ুস বর্গ হোইবি ধর্ষণসহ একাধিক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। এদিকে এপস্টেইনের সঙ্গে মেটে-মারিতের যোগাযোগ নিয়েও বিতর্ক হয়। এসব ঘটনায় রাজপরিবারের জনপ্রিয়তা কমেছে। ২০২৪ সালে ৭২ শতাংশ সমর্থন থাকলেও সাম্প্রতিক এক জরিপে তা ৫৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
তবে রাজপরিবারের নানা বিতর্কের মধ্যেও রাজা হারাল্ডের প্রতি নরওয়েজিয়ানদের ভালোবাসা ছিল অটুট। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজপরিবারের সংকটের জন্য মানুষ সাধারণত তাকে দায়ী করেনি। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে হাকনও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কিউএনবি/আয়শা/২৮ অগাস্ট ২০২৬,/বিকাল ৩:২৮