বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন

আয়ের চেয়ে লাগামহীন ব্যয়, রেকর্ড ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ২০ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক  : সরকারি আয়ের চেয়ে ব্যয় লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন (৪০ লাখ কোটি) ডলারের ঐতিহাসিক রেকর্ড অতিক্রম করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণ। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের প্রকাশিত সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশটির ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতিটি গভীর অর্থসংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বুধবার (১৯ আগস্ট) প্রকাশিত মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রথমবার শপথ গ্রহণ করেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯.৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তারপর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই দেনার পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। এই অভূতপূর্ব ঋণ বৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ঘটেছে ২০২০ সালের মার্চে করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পরবর্তী দুই বছরে, যখন ট্রাম্প ও তার উত্তরসূরি জো বাইডেন—উভয় প্রশাসনই মহামারির জরুরি ধাক্কা সামলাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন ঋণ বেড়েছে ৩.৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মিলিয়ে তার দুটি মেয়াদে এ পর্যন্ত মোট ১১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের চার বছরের মেয়াদে ঋণ বেড়েছিল ৮.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। বাইডেন প্রশাসনের এই অর্থ প্রধানত মহামারি থেকে পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, ক্লিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব শক্তি খাতে ভর্তুকি এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির বিভিন্ন উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছিল।

এ নিয়ে নিরপেক্ষ চিন্তাবিদ সংস্থা ‘বাইপার্টিসান পলিসি সেন্টার’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্গারেট স্পেলিংস সতর্ক করে বলেন, আমাদের ফেডারেল কর্মসূচিগুলোতে সরকারের রাজস্ব আয়ের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে এবং বাজেটের সবচেয়ে বড় খাতগুলো কার্যত অটো পাইলটে চলছে। তিনি আরও যোগ করেন, এই বিশাল ফেডারেল ঋণ ইতিমধ্যেই মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় ও বিনিয়োগকে সংকুচিত করছে, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের অর্থনীতি ও আমেরিকানদের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির জন্য চরম হুমকি সৃষ্টি করছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এই ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল ঋণের অর্থ দাঁড়ায় দেশটির প্রতিজন নাগরিকের ওপর গড়ে আনুমানিক ১,১৭,০০০ ডলার এবং পরিবারপ্রতি প্রায় ২,৯৭,০০০ ডলারের দেনা। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘পিটার জি পিটারসন ফাউন্ডেশন’-এর হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ঋণের পরিমাণ চীন, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও ভারতের মতো পাঁচটি বৃহৎ অর্থনীতির সম্মিলিত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় সমান।

ট্রেজারি বিভাগের তথ্যমতে, সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মাসিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৩২ বিলিয়ন ডলারে, যা মার্কিন ইতিহাসের চতুর্থ সর্বোচ্চ মাসিক ঘাটতি। ট্রাম্প প্রশাসন আদালতের রায়ে বাতিল হওয়া শুল্কের অর্থ ফেরত দেওয়ার কারণে শুল্ক বাবদ রাজস্ব আয় টানা তিন মাসের জন্য ঋণাত্মক বা নেতিবাচক পর্যায়ে নেমে গেছে। একই সময়ে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও মেডিকেয়ার সুবিধার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের বাজেট ঘাটতি ইতিমধ্যেই পুরো ২০২৫ অর্থবছরের মোট ঘাটতিকে অতিক্রম করে গেছে, অথচ চলতি অর্থবছরের আরও দুই মাস বাকি রয়েছে।

দলীয় অনাগ্রহ সত্ত্বেও ট্রাম্প ও বাইডেন উভয়ের নীতিগত সিদ্ধান্তই সরকারের আগের আইনের চেয়ে ঋণ বৃদ্ধি তরান্বিত করেছে বলে জানায় ‘কমিটি ফর আ রেসপন্সিবল ফেডারেল বাজেট’। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রধান আইন ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর কারণে আরও ৪.৭ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ যুক্ত হবে। যদিও ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে বাজেট ছাঁটাইয়ের জন্য বেসরকারি সংস্থা ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ (ডিওজিই)-কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তবে তাদের ব্যয় সংকোচন মূলত বাজেটের সবচেয়ে ছোট অংশ ‘ডিসক্রিশনারি’ বা ঐচ্ছিক খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বার্ষিক প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে, যার ৬০ শতাংশই নির্ধারিত থাকে ‘ম্যান্ডেটরি’ বা বাধ্যবাধকতামূলক কর্মসূচির জন্য—যেমন সামাজিক নিরাপত্তা, মেডিকেয়ার, মেডিকেইড ও সাবেক সৈন্যদের ভাতা, যা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত বাড়ে। এ ছাড়া আরও ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার চলে যায় কেবল গৃহীত ঋণের সুদ পরিশোধেই। ২০২৫ অর্থবছরে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের (পেন্টাগন) মোট বাজেটকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। চলতি ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সুদ পরিশোধের এই খরচ মেডিকেয়ার স্বাস্থ্য ব্যয়কে পেছনে ফেলে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার পর মার্কিন বাজেটের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের খাতে পরিণত হয়েছে। মূলত ‘বেবি বুমার’ প্রজন্মের অবসর ও চিকিৎসাব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে ওয়াশিংটন, কিন্তু আয়কর ও পে-রোল ট্যাক্সের রাজস্ব আদায় সেই ব্যয়ের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা

কিউএনবি/অনিমা/২০ অগাস্ট ২০২৬,/দুপুর ১:৩৯

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

August 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit