স্পোর্টস ডেস্ক : এক মাস ধরে পৃথিবীর ক্যালেন্ডার অন্য নিয়মে চলেছে। রাত মানেই ফুটবল। ঘুম মানেই আপোষ। সকাল মানেই আগের রাতের গোল নিয়ে আলোচনা। অফিসে, চায়ের দোকানে, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে, গ্রামের বাজারে, শহরের ক্যাফেতে একই গল্প। বিশ্বকাপ। একদিন আসে শেষ রাত। যে আলো এক মাস ধরে পৃথিবীকে জাগিয়ে রেখেছিল, সেই আলো নিভে যাওয়ার সময় হয়ে যায়। স্টেডিয়ামের আকাশে শেষবারের মতো আতশবাজি উঠবে। শেষবারের মতো বাজবে বিশ্বকাপের সংগীত। তারপর সব শেষ।
একটি দেশ হাসবে। বাকিরা নীরবে ফিরে যাবে। ফাইনালের আগে দুটি ড্রেসিংরুম। দুই রকম নীরবতা। এক দলের চোখে স্বপ্নের শেষ ধাপ। অন্য দলের চোখে ইতিহাস ছোঁয়ার অপেক্ষা। কোচ শেষ কথা বলছেন। কেউ মাথা নিচু করে শুনছেন। কেউ চোখ বন্ধ করেছেন। কেউ বুকের ওপর হাত রেখে জাতীয় সংগীতের প্রথম লাইন মনে মনে গেয়ে নিচ্ছেন।
তারপর দরজা খুলে যায়। বাইরে অপেক্ষা করছে কোটি মানুষের স্বপ্ন। নব্বই মিনিট পর সেই স্বপ্নের ভাগ্য লেখা হবে। গ্যালারিতে একজন বাবা ছেলেকে কাঁধে বসিয়েছেন। শিশুটি কিছুই বোঝে না। শুধু জানে জিততে হবে। হাজার মাইল দূরে একটি মা টেলিভিশনের সামনে বসে আছেন। মাঠে তার ছেলে দেশের জার্সি পরে খেলছে। প্রতিটি ট্যাকলে তার বুক কেঁপে ওঠে। কোনো বৃদ্ধ হয়ত জীবনের শেষ বিশ্বকাপ দেখছেন। কোনো প্রবাসী ছোট্ট একটি পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো হাসপাতালে রোগীর পাশে মোবাইল ফোনে চলছে ফাইনাল।
বিশ্বকাপ কখনো শুধু মাঠে খেলা হয় না। একই সঙ্গে কোটি ঘরে খেলা হয়। শেষ রাতে গোলের মূল্য অন্য রকম। কয়েক সেকেন্ডের একটি মুহূর্ত একটি দেশের ইতিহাস বদলে দেয়। আবার একজন ফুটবলারের সারাজীবনের বোঝা হয়ে থাকে। শেষ বাঁশি বাজতে আর কয়েক মিনিট। স্টেডিয়ামে তখন সময় ধীরে চলে। গ্যালারিতে কেউ প্রার্থনা করছেন। কেউ চোখ বন্ধ করেছেন। কেউ আর খেলা দেখতেই পারছেন না। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ কয়েক মিনিট তখন শুরু হয়।
তারপর…রেফারির বাঁশি। একটি দল দৌড়ে যায়। আরেকটি দল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই দৃশ্য পৃথিবী প্রতি চার বছর পরপর দেখে। কখনো পুরোনো লাগে না। যারা জেতে, তারা বিশ্বাস করতে পারে না সত্যিই জিতেছে। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। কেউ আকাশের দিকে তাকায়। কেউ কাঁদতে কাঁদতে সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে। কেউ দুই হাতে মুখ ঢেকে রাখে। আনন্দেরও ভাষা থাকে না। যারা হারে, তাদের কান্নাও নীরব।
কেউ মেডেল নিতে যেতে চান না। কেউ ট্রফির দিকে তাকাতেও পারেন না। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে কাপটি তাদের স্বপ্ন ছিল, সেটি তখন সবচেয়ে দূরের বস্তু। ফুটবল এমনই নিষ্ঠুর। দুই ঘণ্টার ব্যবধানে একজন নায়ক হয়। আরেকজন হয় অপূর্ণতার প্রতীক।
আসে সেই মুহূর্ত, যার জন্য চার বছর অপেক্ষা। বিশ্বকাপ ট্রফি। সোনালি আলোয় ঝলমল করা ছোট্ট একটি ট্রফি। পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পুরস্কার। একজন অধিনায়ক সেটি দুই হাতে তুলে ধরেন। মুহূর্তেই আকাশ ভরে যায় কনফেটিতে। আতশবাজির আলোয় হারিয়ে যায় চোখের জল। একটি দেশের কোটি মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। অচেনা মানুষ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে। কেউ জাতীয় পতাকা কাঁধে নেয়। কেউ গাড়ির ছাদে উঠে গান গায়।
কেউ শুধু কাঁদে। এমন কান্না দুঃখের নয়। এমন কান্না অপেক্ষার। একটি দেশের বহু বছরের স্বপ্ন পূরণের। হারা দলের ড্রেসিংরুমে অন্য গল্প। সেখানে খুব বেশি শব্দ থাকে না। জার্সিগুলো ঘামে ভেজা। বুট খুলে রাখা। কেউ এক কোণে বসে আছেন। কেউ মাথা নিচু করে কাঁদছেন। কেউ শূন্য চোখে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছেন। কেউ হয়ত কখনো বিশ্বকাপ খেলবেন না।
একটি স্বপ্ন সেখানেই শেষ হয়ে যায়। ফুটবলের গল্প শেষ হয় না।
স্টেডিয়ামের আলো ধীরে ধীরে নিভতে শুরু করে। দর্শকেরা বাড়ি ফেরেন। পতাকাগুলো ভাঁজ হয়ে যায়। সাংবাদিকেরা শেষ প্রতিবেদন লেখেন। ক্যামেরা বন্ধ হয়। যে মাঠে কিছুক্ষণ আগেও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উৎসব ছিল, সেখানে আবার নেমে আসে নীরবতা। বিশ্বকাপ বিদায় নেয় ঠিক এভাবেই। সে কখনো পুরোপুরি চলে যায় না। কোনো শিশুর আলমারিতে নতুন কেনা একটি জার্সি থেকে যায়। কোনো বাবার মুখে থেকে যায় একটি গোলের গল্প। কোনো মায়ের চোখে থেকে যায় ছেলের জন্য করা প্রার্থনা। কোনো বৃদ্ধের স্মৃতিতে থেকে যায় আরেকটি ফাইনালের রাত।
চার বছর অনেক দীর্ঘ সময়। একটি শিশুর জন্য প্রায় অর্ধেক শৈশব। একজন তরুণের জন্য নতুন জীবন। একজন কিংবদন্তির জন্য বিদায়। কোনো কিশোরের জন্য শুরু। পরের বিশ্বকাপ যখন আসবে, পৃথিবী বদলে যাবে। নতুন মুখ আসবে। পুরোনো নায়ক সরে যাবেন। নতুন জার্সি তৈরি হবে। নতুন গান বাজবে। নতুন কান্না জন্ম নেবে।
তবু শেষ রাতের অনুভূতি বদলাবে না। বিশ্বকাপ শেষ মানে এক মাসের ভালোবাসার বিদায়। অসংখ্য রাত জেগে থাকার বিদায়। অগণিত গল্পের বিদায়। পৃথিবী আবার নিজের ছন্দে ফিরে যাবে। কোথাও না কোথাও, কোনো শিশু ঘুমানোর আগে বলটা বুকে জড়িয়ে ফিসফিস করে বলবে, ‘একদিন আমিও বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলব।’ সেখান থেকেই শুরু হয়ে যাবে পরের বিশ্বকাপের প্রথম গল্প।
কিউএনবি/আয়শা/১৭ জুলাই ২০২৬,/বিকাল ৩:৪০