জসীম উদ্দিন জয়নাল,পার্বত্যাঞ্চল প্রতিনিধি : পাহাড়ে টানা বর্ষণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারিয়ে চরম বিপাকে পড়া অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে বরাবরের মতোই মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এরই ধারাবাহিকতায় খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় অতিবর্ষণ ও পাহাড় ধসে বসতঘর হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া বৃদ্ধ কচাকলা ত্রিপুরার দায়িত্ব নিয়েছে সেনাবাহিনী। দুর্গম এলাকার ওই ক্ষতিগ্রস্ত বৃদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি বসতঘর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে গুইমারা রিজিয়নের ১৮ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারির আওতাধীন মাটিরাঙ্গা জোন।
সোমবার (১৩ জুলাই) মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়নের অত্যন্ত দুর্গম তপ্ত মাস্টারপাড়া এলাকা সরো জমিনে পরিদর্শন করেন মাটিরাঙ্গা জোনের জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাসুদ খানঁ পিএসসি জি । এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত প্রবীণ নাগরিক কচাকলা ত্রিপুরার সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেন, তাঁর শারীরিক ও মানসিক খোঁজখবর নেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বসবাসের জন্য একটি নিরাপদ ঘর তৈরি করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। একই সাথে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তাদের আগামী মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) থেকেই ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন।
এসময় মাটিরাঙ্গা জোনের উপ অধিনায়ক মেজর আলতাফ মাহমুদ রুবেল পিএসসি জি, মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব সুনি ত্রিপুরা এবং দয়া হেডম্যানপাড়ার হেডম্যান দ্বীনময় ত্রিপুরাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের টানা ও মুষলধারে বর্ষণে মাটিরাঙ্গার পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এরই একপর্যায়ে তপ্ত মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দা কচাকলা ত্রিপুরার মাটির তৈরি একমাত্র বসতঘরটি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে তিনি প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এলে মাটিরাঙ্গা জোনের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। বৃদ্ধের এই মানবিক বিপর্যয় ও কষ্টের কথা বিবেচনা করে জোন সদরের নির্দেশে দ্রুততম সময়ে নতুন ঘর নির্মাণের এই মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেনাবাহিনীর কাছ থেকে নতুন ঘর পাওয়ার এই আকস্মিক ও অভাবনীয় সুখবরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বৃদ্ধ কচাকলা ত্রিপুরা। আনন্দাশ্রু ভেজা চোখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সব হারিয়ে আমি যখন খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন সেনাবাহিনী আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই সহযোগিতা আমার জীবনে নতুন করে বেঁচে থাকার ও মাথা গোঁজার আশার আলো জ্বালিয়েছে। আমি সারাজীবন সেনাবাহিনীর এই ঋণ ভুলব না।” এ সময় তিনি সেনাবাহিনীর সকল সদস্যের দীর্ঘায়ু ও সার্বিক সফলতা কামনা করেন।
এদিকে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অসহায় এক আদিবাসী বৃদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে সেনাবাহিনীর এই দ্রুত ও মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, কার্বারি (পাড়া প্রধান) এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ খাগড়াছড়ি গুইমারা রিজিয়ন ও মাটিরাঙ্গা জোনের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। স্থানীয়দের মতে, সেনাবাহিনীর এমন উদ্যোগ পাহাড়ে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সম্প্রীতি ও আস্থার বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে।
মাটিরাঙ্গা জোনের জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাসুদ খানঁ পিএসসি জি বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের শান্তি, সম্প্রীতি, শৃঙ্খলা ও সামগ্রিক উন্নয়নের পাশাপাশি যেকোনো মানবিক কল্যাণে সবসময় সাধারণ জনগণের পাশে রয়েছে। ‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে’—এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে পাহাড়ি অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের সুখ-দুঃখে সেনাবাহিনী অতীতেও কাজ করেছে, বর্তমানেও করছে এবং ভবিষ্যতেও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় এ ধরনের মানবিক ও জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।