স্পোর্টস ডেস্ক : মহাআড়ম্বরে শুরু হয়েছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর; বিশ্বকাপ। কিন্তু যে দেশে এই আয়োজন, সেই যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মনে কি আদৌ লেগেছে বিশ্বকাপের হাওয়া? নিউইয়র্কের ম্যানহাটন থেকে শুরু করে সান্টা মনিকার সমুদ্র সৈকত; সবখানেই এখন অন্য এক উন্মাদনা। তবে সেই উন্মাদনা ফুটবল নিয়ে নয় বরং বাস্কেটবল নিয়ে।
গত বুধবার রাতে এনবিএ ফাইনালসের ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে সান আন্তোনিও স্পার্সকে হারিয়েছে নিউইয়র্ক নিক্স। আর তাতেই উৎসবের জোয়ারে ভেসেছে পুরো নিউইয়র্ক সিটি। এই দৃশ্যটিই মনে করিয়ে দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল খেলাটিকে এখনো অতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় না। খেলাটিকে বাস্কেটবল কিংবা আমেরিকান ফুটবলের মতো জনপ্রিয় খেলাগুলোর সঙ্গে কতটা কঠিন লড়াই লড়তে হচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি জরিপ তো বলছে, জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেক আমেরিকানই এই টুর্নামেন্ট নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাচ্ছেন না। নানা রাজনৈতিক বিতর্ক আর টিকিটের আকাশচুম্বী মূল্যের পর এবার মাঠের লড়াইয়ে নামছে স্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে তাদের প্রথম প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়ে। কিন্তু আমেরিকার সাধারণ মানুষের উত্তেজনা ঠিক কোন পর্যায়ে?
যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়বারের মতো পুরুষ বিশ্বকাপের আয়োজন করছে। এর আগে ১৯৯৪ সালে তারা সফলভাবে এই আসর সামলেছিল, যা দেশটির ফুটবল সংস্কৃতিতে বড়সড় পরিবর্তন এনেছিল এবং মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। তবে তিন দশক পেরিয়ে এবারের আসরটি যেন এখনো সাধারণ মানুষের মনে সেই চেনা রোমাঞ্চ জাগিয়ে তুলতে পারছে না। একটু খুঁটিয়ে দেখলে নিউইয়র্কে বিশ্বকাপের আবহ চোখে পড়ে বৈকি।
সাবওয়ে ট্রেনগুলো সেজেছে জাতীয় দলের রঙে, টাইমস স্কয়ারের বিশাল বিলবোর্ডে শোভা পাচ্ছে লিওনেল মেসির মুখ, আর রাস্তায় মরক্কো বা ব্রাজিলের জার্সি গায়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের। কিন্তু নিউইয়র্কবাসী এখন বুঁদ হয়ে আছেন কেবল বাস্কেটবলে। আগামীকাল শনিবার যদি নিউইয়র্ক নিক্স তাদের ম্যাচে জয় পায়, তবে ১৯৭৩ সালের পর প্রথমবারের মতো তারা ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা ঘরে তুলবে। স্থানীয় এক বাস্কেটবল ভক্ত সোজাসুজি বলেই দিলেন, তিনি এখন নিক্স ছাড়া আর কিছুই ভাবছেন না, বিশ্বকাপের খবর রাখার কোনো সময় তার নেই। অন্য এক সমর্থক অবশ্য জানালেন, বাস্কেটবলের ফাইনাল শেষ হলেই তিনি ফুটবলে মন দেবেন।
অন্যতম আয়োজক শহর লস অ্যাঞ্জেলেসের চিত্রটাও প্রায় একই রকম। বিমানবন্দর থেকে বের হতেই চোখে পড়ে টুর্নামেন্টের নানা ব্যানার, বিলবোর্ডে ঘুরছে যুক্তরাষ্ট্রের স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের ছবি, আর শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে লিওনেল মেসির বিশাল এক দেয়ালচিত্র। তবে যারা নিয়মিত ফুটবলের খোঁজখবর রাখেন না, তাদের পক্ষে বিশ্বকাপ যে শুরু হচ্ছে তা টের পাওয়া বেশ কঠিন।
এক ট্যাক্সিচালক তো অবাক হয়ে বিবিসি সংবাদকর্মীদের জিজ্ঞেসই করে বসলেন, সত্যিই কোনো বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে কি না, কিংবা সেখানে কারা খেলছে। অবশ্য লস অ্যাঞ্জেলেস বিশ্বকাপ আয়োজক কমিটির সহ-সভাপতি ল্যারি ফ্রিডম্যান বেশ আশাবাদী। তার মতে, উত্তেজনাটা একটু ধীরগতিতে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা উন্মাদনায় রূপ নেবে। লস অ্যাঞ্জেলেসে নানা সংস্কৃতির মানুষের বসবাস এবং তাদের নিজ নিজ দেশের দল এখানে খেলবে, তাই সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শহরের মানুষ ঠিকই ফুটবল জ্বরে কাঁপবে।
তরুণ প্রজন্মের আমেরিকানদের মধ্যে অবশ্য এক ধরনের নতুন উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে, যারা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের স্বাদ পাননি। অনেকে বন্ধুদের নিয়ে খেলা দেখার জন্য ‘ওয়াচ পার্টি’র আয়োজনও করে ফেলেছেন। তাদের বিশ্বাস, ফুটবল ইতিমধ্যে বেসবলের চেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যদিও বাস্কেটবল বা আমেরিকান ফুটবলকে ছাড়িয়ে যাওয়া এখনো অনেক দূরের পথ। এদিকে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা স্কটল্যান্ডের সমর্থকেরা বোস্টনে এসে কিছুটা অবাকই হয়েছেন। স্কটিশ জার্সি গায়ে এক সমর্থককে যখন স্থানীয় এক নারী জিজ্ঞেস করেন তিনি এখানে ছুটি কাটাতে এসেছেন কি না, তখন তিনি বুঝলেন যে স্থানীয় অনেকেই জানেন না এখানে বিশ্বকাপ চলছে। পাবগুলো দারুণ জমজমাট হলেও সাধারণ মানুষের এই উদাসীনতা বেশ স্পষ্ট।
তবে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে টিকেটের আকাশচুম্বী দাম। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী ম্যাচের সবচেয়ে সস্তা টিকেটের দামও ঠেকেছে ১,১২০ ডলারে, যা বাংলাদেশি টাকায় বিশাল অঙ্ক। ফলে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার মাঠে গিয়ে খেলা দেখার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ঘরে বসে খেলা দেখতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে মাঠের বাইরে সমর্থনের কমতি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল দলের একটি মাত্র ৩০ মিনিটের উন্মুক্ত অনুশীলন সেশনের ৫,০০০ টিকেটের জন্য প্রায় ৩০,০০০ সমর্থক নিবন্ধন করেছিলেন। মার্কিন ফুটবল দলের খেলোয়াড়দেরও নানা ব্যতিক্রমী উপায়ে প্রচারণায় নামানো হচ্ছে, যার মধ্যে ফ্যাশন ম্যাগাজিনের কভারে জায়গা করে নেওয়া অন্যতম। শেষ পর্যন্ত মাঠের পারফরম্যান্সে যুক্তরাষ্ট্র দল কত দূর যেতে পারে, তার ওপরেই নির্ভর করছে দেশটির ফুটবলের ভবিষ্যৎ। দল যদি ভালো করতে পারে, তবে ১৯৯৪ সালের মতোই এই বিশ্বকাপও মার্কিন মুলুকে ফুটবলের চেহারাই বদলে দিতে পারে।
কিউএনবি/অনিমা/১২.০৬.২০২৬/দুপুর ১.৪১