বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন

মা-বাবার অবহেলাকারীকে মহানবী (সা.)-এর অভিশাপ

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
  • ২৪ Time View

ডেস্ক নিউজ : পৃথিবীতে মানুষ যাঁদের ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারবে না, তাঁরা হলেন মা-বাবা। সন্তান যখন নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও সচেতন নয়, তখন মা তাকে নিজের রক্ত-মাংস দিয়ে গড়ে তোলেন।

মায়ের গর্ভধারণের কষ্ট, প্রসবের যন্ত্রণা, রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটানো এবং বাবার নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষ করার প্রতিদান পৃথিবীর কোনো সন্তানই পূর্ণভাবে দিতে পারে না।
এ কারণেই ইসলাম আল্লাহর হকের পরপরই মায়ের হককে গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, “আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বোলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না।

আর তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বোলো।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)
অন্য আয়াতে মায়ের কঠিন ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার ব্যাপারে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৪)

কোরআনের এই বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন মা।

অথচ আজ অনেক সন্তান বৃদ্ধা মাকে বোঝা মনে করে, তার প্রয়োজনের খোঁজ নেয় না, এমনকি কখনো কখনো বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করে। অথচ ইসলাম এটিকে ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। হাদিস শরিফে এসেছে, আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) একদা তিনবার বললেন, আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহগুলো সম্পর্কে অবহিত করব না? সবাই বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! অবশ্যই বলুন। তিনি বলেন, আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা এবং মা-বাবার অবাধ্য হওয়া।
(বুখারি, হাদিস : ২৬৫৪)

নাউজুবিল্লাহ! মা-বাবাকে অবহেলা করা কতটা জঘন্য অপরাধ হলে এই হাদিসে শিরকের পরপরই মা-বাবার অবাধ্যতার কথা বলা হয়েছে।

ইসলাম মা-বাবার অধিকারকে এতটাই প্রাধান্য দিয়েছে যে নফল ইবাদত রেখে তাঁদের আদেশ পালন করা বা তাঁদের খিদমত করাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বনি ইসরাঈলের বিখ্যাত আবেদ জুরাইজের ঘটনা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত শিক্ষণীয়। তিনি নির্জনে ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। একদিন তাঁর মা তাঁকে ডাকলেন। তিনি নফল নামাজে ছিলেন। মা কয়েকবার ডাকলেও তিনি নামাজ ছেড়ে সাড়া দিলেন না। এতে মা কষ্ট পেয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহ! তাকে মৃত্যু দিয়ো না, যতক্ষণ না তাকে ব্যভিচারিণীদের মুখোমুখি করো।’ মায়ের এই কষ্টের পরিণতিতে জুরাইজ ভয়াবহ পরীক্ষার সম্মুখীন হন। এক ব্যভিচারিণী নারী তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ দেয় যে তার গর্ভের সন্তানের পিতা জুরাইজ। লোকেরা তাঁর ইবাদতখানা ভেঙে দেয়, তাঁকে অপমানিত করে এবং জনসমক্ষে হেয় করে। পরে আল্লাহ অলৌকিকভাবে নবজাতক শিশুর মুখ দিয়ে সত্য প্রকাশ করেন এবং জুরাইজ নির্দোষ প্রমাণিত হন। (বুখারি, হাদিস : ২৪৮২)

এই ঘটনা প্রমাণ করে যে কারো ইবাদত, ইলম, পদবি অনেক বড় থাকলেও মায়ের মনে কষ্ট দিয়ে দুনিয়া ও আখিরাতে সুরক্ষিত থাকা সম্ভব নয়। এর বিপরীতে কোনো ঈমানদার যদি তার মায়ের যত্ন নিতে পারে, তাহলে তা তার জন্য জান্নাতের দ্বার খুলে দিতে পারে। কেননা হাদিস শরিফে এসেছে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। (নাসায়ি, হাদিস : ৩১০৪)

অর্থাৎ যে সন্তান মায়ের সেবা করবে, তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ হবে। আর যে ব্যক্তি সেই জান্নাত লাভের সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া করবে, মা-বাবাকে অবহেলা করবে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাঁদের যত্ন নেবে না— তাদেরকে মহানবী (সা.) অভিশাপ দিয়েছেন। তারা সেই অভিশাপের আগুনে ছারখার হয়ে যাবে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক (সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক), আবার সে ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক, আবার তার নাক ধূলিমলিন হোক।’ জিজ্ঞেস করা হলো, কার হে আল্লাহর রাসুল (সা.)। তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার মা-বাবা উভয়কে কিংবা তাদের একজনকে বার্ধক্যজনিত অবস্থায় পেল, এরপরও সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’

মুসলিম, হাদিস : ৬৪০৫)

আহ! কত হৃদয়বিদারক কথা! বৃদ্ধ মা-বাবা ঘরে থাকা মানে জান্নাত অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ ঘরে থাকা। অথচ অনেকেই এই সুযোগকে বোঝা মনে করে। তাদের দূরে সরিয়ে দেয় এবং নিজেকে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করে—নিজেকে দুনিয়াতে লাঞ্ছনাকর কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করে। কেননা হাদিসের ভাষ্য মতে, যেসব পাপের সাজা মহান আল্লাহ দুনিয়ায়ও দেন, তার একটি হলো মা-বাবার অবাধ্যতা ও অবহেলা।

মা-বাবার অবাধ্যতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো—এর শাস্তি শুধু আখিরাতে নয়, দুনিয়াতেও আসে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তার মর্জিমাফিক গুনাহসমূহের মধ্যে যেকোনো গুনাহের শাস্তি প্রদান কিয়ামত পর্যন্ত বিলম্বিত করতে পারেন। কিন্তু তিনি বিদ্রোহ, মা-বাবার অবাধ্যাচরণ ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার গুনাহর শাস্তি অপরাধীর মৃত্যুর আগেই এই দুনিয়াতে দিয়ে থাকেন।’

(আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৫৯৪)

ইতিহাস সাক্ষী, যে সন্তান মায়ের চোখের পানি ঝরিয়েছে, তার জীবন থেকে বরকত উঠে গেছে; আর যে সন্তান মায়ের দোয়া অর্জন করেছে, আল্লাহ তার জন্য এমন দরজা খুলে দিয়েছেন, যা সে কল্পনাও করেনি।

তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত যদি মা-বাবা জীবিত থাকেন, তবে তাঁদের পাশে বসা, তাঁদের কথা শোনা, তাঁদের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা, তাঁদের জন্য সময় বের করা। আর যদি তাঁরা পৃথিবী থেকে চলে গিয়ে থাকেন, তবে তাঁদের জন্য দোয়া করা, সদকা করা এবং তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।

মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা কোটি কোটি টাকা খরচ করেও মায়ের একটি দোয়া ফিরে পাবে না। কিন্তু যার মা জীবিত আছেন, তার কাছে এখনো জান্নাতের একটি দরজা খোলা আছে। সে একটু চেষ্টা করলেই মা-বাবার খিদমতের মাধ্যমে সে দরজা অতিক্রমের চাবি সংগ্রহ করতে পারে।

তাই প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য, মা-বাবাকে অবহেলা নয়, ভালোবাসা দেওয়া; বিরক্তি নয়, সম্মান দেওয়া; কষ্ট নয়, শান্তি দেওয়ার চেষ্টা করা। কারণ মা-বাবার সন্তুষ্টির মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর মা-বাবার চোখের পানির মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে দুনিয়া ও আখিরাতের অকল্যাণ। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেসব অকল্যাণ থেকে রক্ষা করুন। মহানবী (সা.)-এর অভিশাপ থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন। আমিন।

কিউএনবি/অনিমা/০৪.০৬.২০২৬/সকাল ১১.৫৮

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

June 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit