মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৮ অপরাহ্ন

বার্ধক্য ঠেকানোর প্রকল্পে পুতিনের ২৬ বিলিয়ন ডলার

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬
  • ৪৪ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ক্ষমতা ও শক্তিকে বশে রাখতে বার্ধক্যের সঙ্গেই যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। বিজ্ঞানী-চিকিৎসকদের ঘাড়ে বন্দুক ঠেকিয়ে নির্দেশ জারি করেছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যুবক হওয়ার ওষুধ আবিষ্কার করতে হবে। এজন্য মোটা অঙ্কের তহবিল বরাদ্দ দিয়েছেন তিনি। 

গত সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ের এক সামরিক কুচকাওয়াজে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ভ্লাদিমির পুতিনের কথোপকথন শোনা গিয়েছিল। যেখানে তিনি বলেছিলেন, একদিন মানুষ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন করে অমরত্ব লাভ করতে পারবে। অনেকে এটাকে বয়স্ক দুই নেতার অদ্ভুত খোশগল্প বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

কিন্তু বাস্তবে এই কথোপকথন রাশিয়ায় ক্রেমলিন-সমর্থিত এক বড়সড় দীর্ঘায়ু (লংজেভিটি) এজেন্ডার প্রতিফলন। যা এখন রাশিয়ার বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। সিলিকন ভ্যালির জেফ বেজোস, স্যাম অল্টম্যান ও পিটার থিয়েলের মতো পুতিনও দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্য-বিরোধী গবেষণায় আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন।
 
রাশিয়ায় এটি এখন রাষ্ট্রীয় সমর্থনপুষ্ট একটি বড় প্রকল্প বা কর্মসূচিতে রূপ নিয়েছে। যেখানে অর্গান প্রিন্টিং তথা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি, মিনি-পিগের মাধ্যমে জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন এবং চরম ঠান্ডায় শরীরের এক্সপোজারের মতো বিভিন্ন পদ্ধতিতে বার্ধক্য ধীর করার চেষ্টা চলছে।
  
গত মাসে রুশ সরকার জানায়, ‘নতুন স্বাস্থ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তি’ উদ্যোগের অধীনে বিজ্ঞানীরা কোষীয় বার্ধক্য ধীর করার জন্য জিন থেরাপি তৈরি করছেন। প্রকল্পটি পুতিনের বার্ধক্য ঠেকানোর প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত যেখানে তিনি সম্প্রতি ২৬ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছেন।
 
উপ-বিজ্ঞানমন্ত্রী ডেনিস সেকিরিনস্কি এই প্রকল্পকে বার্ধক্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল পন্থাগুলোর একটি বলে বর্ণনা করেছেন। কর্মকর্তারা ল্যাবে তৈরি অঙ্গ প্রতিস্থাপন নিয়েও গবেষণার কথা উল্লেখ করেছেন— যা পুতিন বেইজিংয়ে উল্লেখ করেছিলেন।
 
২০২৪ সালে চালু হওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য এই দশকের শেষ নাগাদ ১ লাখ ৭৫ হাজার জীবন বাঁচানো। সমালোচকরা বলছেন, এই সংখ্যাটি ইউক্রেনে রুশ সেনাদের আনুমানিক ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে প্রায় মিলে যায়।
 
প্রকল্পটি বায়োপ্রিন্টিং (জীবন্ত টিস্যু ৩ডি প্রিন্টিং) এবং জেনোট্রান্সপ্লান্টেশনের ওপর জোর দিচ্ছে। এতে জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত মিনি-পিগের ভিতরে মানুষের উপযোগী অঙ্গ বড় করা হয়।
 
গবেষকরা মানুষের কার্টিলেজ ও ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি ছাপানোয় অগ্রগতির দাবি করেছেন। ২০৩০ সাল নাগাদ পুরো অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই রকম সময়সীমা পিগ-জাত অঙ্গের ক্ষেত্রেও আলোচনা চলছে। ক্রেমলিন বলছে, একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় সমর্থন রয়েছে এবং এটি একটি সমন্বিত জাতীয় প্রচেষ্টা।
 
এই উদ্যোগের মূল ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন পুতিনের মেয়ে মারিয়া ভোরন্তসোভা (এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট এবং জেনেটিক্স কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত) এবং পদার্থবিদ মিখাইল কোভালচুক, যিনি কুর্চাতোভ ইনস্টিটিউটের প্রধান। তাকে এই উদ্যোগের মূল বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি হিসেবে দেখা হয়।
 
কোভালচুক বলেছেন, ভবিষ্যতের বিজ্ঞান মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্রমাগত মেরামত ও প্রতিস্থাপন সম্ভব করে তুলবে। অমরত্বকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন হলেও, মানুষের শরীর মেরামতের ক্ষমতা ক্রমশ বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
 
পশ্চিমা দেশে যেখানে টেক বিলিয়নিয়াররা এ ধরনের গবেষণা অর্থায়ন করেন, সেখানে রাশিয়ার এই কর্মসূচি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নালে খুব কম পিয়ার-রিভিউড গবেষণা প্রকাশ করতে পেরেছে। অনেক বিজ্ঞানী বলছেন, অগ্রগতির দাবিগুলোকে প্রমাণিত ফলাফলের চেয়ে আকাঙ্ক্ষা হিসেবেই দেখা উচিত।
 
বায়োপ্রিন্টিংয়ে কাজ করা রুশ গবেষক আলেকজান্ডার অস্ট্রোভস্কি বলেন, বিজ্ঞান একা এগোতে পারে না। নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সীমিত হয়ে যাওয়ায় অগ্রগতি ধীর হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অর্থায়ন নিশ্চিত করতে কর্মকর্তারা অতিরিক্ত আশাবাদী ফলাফল উপস্থাপন করতে পারেন।
 
কোভালচুক দীর্ঘায়ু গবেষণাকে পশ্চিমের সঙ্গে সভ্যতার সংঘাত হিসেবেও দেখেন। ২০১৫ সালের এক বক্তৃতায় তিনি ভবিষ্যতে ‘দাসসুলভ মানুষ’ তৈরির আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। তিনি কোভিড-১৯ মহামারিকে পশ্চিমের সঙ্গে যুক্ত করেও দাবি করেছেন।
 
পুতিনও কখনো কখনো এমন বক্তব্য দিয়েছেন। কোভালচুক সোভিয়েত আমলের পশ্চিমা ষড়যন্ত্র নিয়ে নির্মিত সিনেমাগুলোকে প্রভাবশালী বলে উল্লেখ করেছেন। পুতিনও বলেছেন, এসব কাজ তাঁকে কেজিবিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে।
 
আরেকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হলেন ভ্লাদিমির খাভিনসন। তিনি পশুর টিস্যু থেকে তৈরি পেপটাইড-ভিত্তিক বার্ধক্যবিরোধী চিকিৎসার জন্য পরিচিত। পুতিনের কাছ থেকে বড় রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খাভিনসন একবার বলেছিলেন, নেতাদের আয়ু বাড়িয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এড়ানো সম্ভব এবং মানুষ ১২০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। তিনি ২০২৪ সালে ৭৭ বছর বয়সে মারা যান।
 
যদিও খাভিনসন ও কোভালচুক যোগ্য বিজ্ঞানী, সমালোচকরা বলছেন রাশিয়ার গবেষণা পরিবেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া ফলাফল খুব কম উৎপাদন করছে। ইউক্রেন আক্রমণের পর দেশ ছাড়া অনেক গবেষক বলছেন, নিষেধাজ্ঞা বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়কে আরও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে এবং সহযোগিতা কমিয়েছে।
 
পুতিন প্রায়ই পশু শিকার, হকি ও মোটরসাইকেল চালিয়ে নিজের শারীরিক সক্ষমতা ও সক্রিয়তার ছবি তুলে ধরেন। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলেন, এর পেছনে বার্ধক্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে— বিশেষ করে কোভিডকালে কঠোর বিচ্ছিন্নতা ও লম্বা টেবিল এই সতর্কতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
 
পুতিনের চেহারার পরিবর্তন নিয়ে কসমেটিক প্রসিডিউর নিয়েও জল্পনা চলছে। তার ঘনিষ্ঠ অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও সত্তরের দশকে, যা রাশিয়ার রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির বার্ধক্যকেই প্রতিফলিত করে।
 
রাশিয়ার এই দীর্ঘায়ু নিয়ে মনোযোগ সোভিয়েত আমলের জীবন বাড়ানোর ব্যর্থ কিছু পরীক্ষার কথাও মনে করিয়ে দেয়। আধুনিক গবেষণা সত্ত্বেও দেশটির গড় আয়ু এখনও পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম, বিশেষ করে পুরুষদের গড় আয়ু ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক নিচে। 
 
শেষ পর্যন্ত ক্রেমলিনের আয়ু বাড়ানোর এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইতিহাসের সব শাসকদের সামনে যে সীমাবদ্ধতা ছিল, সেই মৃত্যুর সীমাকেই চ্যালেঞ্জ করছে। 
 
তথ্যসূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

 

 

কিউএনবি/আয়শা/২৯ মে ২০২৬,/রাত ১০:৪০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

July 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit