খবরে বলা হয়েছে, আবদুল রহিমকে মুক্তি দিতে নিহত নাবালকের পরিবারকে প্রায় ১৫ লাখ সৌদি রিয়াল (প্রায় ৩৪.৩৫ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়া হয়। এই অর্থ প্রদানের পরই তাকে ক্ষমা করা হয়। ইসলামি আইন অনুযায়ী এই আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়াকে ‘দিয়াহ’ বলা হয়, যা অনিচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে সমঝোতার ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড বা শাস্তি থেকে মুক্তির সুযোগ তৈরি করে।
সৌদিতে বসবাসকারী ভারতীয়রা আবদুলের মুক্তির জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ‘ক্রাউড ফান্ডিং’-এর মাধ্যমে ভারতীয় তরুণের মুক্তির জন্য অর্থ সংগ্রহ করা শুরু হয়। হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মালয়ালিরাও। সেই অর্থ দিয়ে দীর্ঘ কারাবাসের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে আবদুলের।
আবদুল রহিম ২০০৬ সালে সৌদি আরবে অটোচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে বেশি আয়ের আশায় তিনি একটি চাকরি নেন এবং ১৫ বছর বয়সি পক্ষাঘাতগ্রস্ত এক নাবালকের ব্যক্তিগত চালক ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ওই কিশোরের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা ছিল এবং তাকে একটি বাহ্যিক চিকিৎসা যন্ত্রের সাহায্যে শ্বাস নিতে হতো।
সংবাদ সংস্থা এএনআই-এর একটি প্রতিবেদন মতে, ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর গাড়ি চালানোর সময় দুর্ঘটনাবশত কিশোরটির চিকিৎসা সহায়ক যন্ত্রে রহিমের হাত লেগে যায়। এর ফলে যন্ত্রটি বিচ্ছিন্ন হয়ে কিশোরটি অচেতন হয়ে পড়ে এবং পরে মারা যায়। সৌদি আরবে পৌঁছানোর মাত্র ২৮ দিনের মাথায় তাকে গ্রেফতার করা হয়।
বিচার শুরু হলে আদালতে তিনি দাবি করেন, গাড়ি চালানোর সময় কিশোরটি তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছিল এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত যন্ত্রে হাত লেগে যায়। তবে আদালত তার এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি। ২০১১ সালে সৌদি আদালত তাকে নাবালক হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন, যা ২০২২ সালে আপিল আদালতও বহাল রাখে।
এরপর সর্বোচ্চ আদালতে পুনর্বিবেচনার পর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার শেষে ২০২৪ সালে নিহত নাবালকের পরিবার ১৫ লাখ সৌদি রিয়াল ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করে রহিমকে ক্ষমা করতে সম্মত হয়। এরপর সৌদি আদালত ২০২৪ সালের ২ জুলাই তার মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাহার করে। তবে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে বলা হয়। আরবি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গত ২০ মে তার সাজা শেষ হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একই ধরনের আরেকটি আলোচিত মামলার কথাও সামনে এসেছে, যেখানে কেরালার পালাক্কাড় জেলার নার্স নিমিশা প্রিয়া ইয়েমেনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায় রয়েছেন। নিমিশা ২০০৮ সালে নার্সিং কাজের জন্য ইয়েমেনে যান এবং পরে সেখানে নিজস্ব ক্লিনিক খোলার পরিকল্পনা করেন। তিনি স্বামী টমি থমাস ও কন্যাসন্তানকে নিয়ে সেখানে বসবাস করতেন। ২০১৪ সালে তার স্বামী ও সন্তান ভারতে ফিরে এলেও তিনি ইয়েমেনে থেকে যান।
পরে ইয়েমেনি নাগরিক তালাল আব্দো মাহদির সঙ্গে পরিচয়ের পর তারা একসঙ্গে ক্লিনিক পরিচালনা শুরু করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মাহদি তার পাসপোর্ট ও অর্থ কেড়ে নেন এবং নির্যাতনও করেন। আইনি কাগজপত্রে তাকে স্ত্রী হিসেবে দেখিয়ে প্রশাসনিক সহায়তা বন্ধ করে দেন বলেও অভিযোগ ওঠে।
২০১৭ সালের ২৫ জুলাই পাসপোর্ট ফিরে পেতে ও পরিস্থিতি থেকে বের হতে নিমিশা মাহদিকে ঘুমের ইনজেকশন দেন। অতিরিক্ত ডোজের কারণে মাহদির মৃত্যু হয়। ইয়েমেন ছেড়ে পালানোর সময় তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং ২০১৮ সালে আদালত মৃত্যুদণ্ড দেন।
তখন থেকে তিনি ইয়েমেনের কারাগারে বন্দি আছেন। তার মুক্তির জন্য পরিবার ও বিভিন্ন সংগঠন কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। ‘ব্লাড মানি’ হিসেবে প্রায় ১.৫ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ ও আইনজীবীর আরও প্রায় ১.৫ কোটি টাকার দাবি উঠেছে।
নিমিশার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। তবে তা পরে স্থগিত করা হয়। বর্তমানে ইয়েমেন সরকার তার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানায়নি। ভারতের পক্ষ থেকেও কূটনৈতিকভাবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।