শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৩৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম

ইরান যুদ্ধ ‘বিশ্ব পরমাণু ব্যবস্থা’ই ওলটপালট করে দিয়েছে

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬
  • ৪৪ Time View

ডেস্কনিউজঃ ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান পরমাণু ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন শুরু হয়েছে। যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ, বেসামরিক পরমাণু বাণিজ্য এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর। কেনেথ লুয়ঙ্গোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই যুদ্ধ ইতিমধ্যে ভেঙে পড়া বৈশ্বিক পরমাণু ব্যবস্থার ওপর সর্বশেষ হাতুড়ির আঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তিগত ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে দুর্বল করে দিয়েছিল। আর বর্তমান সংঘাত সেই ক্ষতকে আরও গভীর করে তুলছে।

ইরান যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করেছে, যেখানে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সক্রিয় পরমাণু কর্মসূচি সামরিক শক্তির মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও অতীতে ইসরায়েল ইরাক বা সিরিয়ার নির্মাণাধীন গবেষণামূলক চুল্লিতে হামলা চালিয়েছে, তবে চলমান এই কর্মসূচিকে পুরোপুরি অকেজো করে দেয়ার চেষ্টার এই ঘটনা ইতিহাসে বিরল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই দাবি করেছেন, ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে ইরানের ফিশাইল মেটেরিয়াল বা পরমাণু জ্বালানির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ৪০০ কেজি সমপরিমাণ অস্ত্র-তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম ইসফাহান পরমাণু কমপ্লেক্সের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যেমন নিয়ন্ত্রণহীন পরমাণু অস্ত্রের ঝুঁকি দেখা দিয়েছিল, ইরানের ক্ষেত্রেও তেমন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে সোভিয়েত সংকটের সময় রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে সহযোগিতা দেখা গিয়েছিল, বর্তমান বৈরী পরিবেশে ইরানের ক্ষেত্রে তা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান সম্ভবত এখন ধ্বংসস্তূপ থেকে ইউরেনিয়াম উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের ওপর নির্ভর করতে ইচ্ছুক। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরান থেকে সরিয়ে না নেওয়া এবং পরমাণু কেন্দ্রগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত এই যুদ্ধ শেষ হবে না। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে এই বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় পদার্থ উদ্ধার করা যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি এটি অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়াও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া।

ইরানের এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-র সীমাবদ্ধতাগুলোকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বর্তমান বিশ্বে যখন পরমাণু শক্তির বিস্তার ঘটছে, তখন আইএইএ-র বর্তমান কাঠামো এবং বাজেট সকল দেশের পরমাণু কর্মসূচি সঠিকভাবে তদারকি করার জন্য অপর্যাপ্ত বলে মনে করা হচ্ছে। যদি এই সংস্থা পরমাণু কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে শক্তিশালী দেশগুলো আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজেরাই সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেবে, যার মহড়া আমরা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে দেখতে পাচ্ছি।

এদিকে, ইরান যুদ্ধের ঢেউ এখন মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান পরমাণু শক্তিগুলোর ওপর আছড়ে পড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলো তাদের পরমাণু বিদ্যুৎ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে চায়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে পরমাণু সহযোগিতা চুক্তিটি এখন এক বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌদি আরব তাদের নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় রাখতে চায়। তবে এটা পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ নীতির পরিপন্থী। তবুও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়া বা চীনের প্রভাব কমাতে যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো এখানে নমনীয় হতে হতে পারে।

বিশ্বের পরমাণু বাজারে বর্তমানে রাশিয়া এবং চীন অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রাশিয়া আকর্ষণীয় আর্থিক প্যাকেজ এবং বর্জ্য ফেরত নেওয়ার সুবিধার মাধ্যমে বাজার দখল করছে, আর চীন তাদের বিশাল শিল্প সক্ষমতা নিয়ে রপ্তানি বাজারে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে তার পুরনো নীতি পরিবর্তন করে সৃজনশীল অংশীদারিত্বের কথা ভাবতে হচ্ছে। কারণ পরমাণু প্রযুক্তি রপ্তানির মানে হলো সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে অন্তত ১০০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা। এটাও বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের মূল চাবিকাঠি।

ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের বিশ্লেষণ

কিউএনবি/বিপুল/১৫.০৫.২০২৬/রাত ১০.৪০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

August 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit