আন্তর্জাতিক ডেস্ক : শনিবার ভোরে ইরানজুড়ে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পুরো অঞ্চল এখন এক ভয়াবহ অস্থিতিশীলতার মুখে দাঁড়িয়েছে। তেহরানসহ ইরানের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে এই আকস্মিক হামলার পরপরই ইরান পাল্টা আঘাত শুরু করেছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরান ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দোহা ও হাইফার আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ধোঁয়া এখন এক মহাবিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘বড় ধরনের সামরিক অপারেশন’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প এবং নৌবাহিনী ধ্বংস করাই এই হামলার মূল লক্ষ্য। ট্রাম্পের দাবি, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি এবং তিনি ইরানি জনগণকে এই সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই হামলাকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ইরানের পক্ষ থেকে আসা চিরস্থায়ী হুমকি নির্মূল করতেই এই সুপরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে জাতিসংঘ সনদের চরম লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই আগ্রাসনের পর আর কোনো সীমারেখা অবশিষ্ট নেই। প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ইতিমধ্যে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত হানার খবর পাওয়া গেছে। ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ও ইসরায়েলি সব স্বার্থ এখন তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু।
এই পাল্টাপাল্টি হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগে ইরানের কঠোর সমালোচনা করেছে। কাতার তাদের আকাশসীমায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা নিশ্চিত করে বলেছে, এটি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। অন্যদিকে বাহরাইন এই হামলাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতামূলক’ বলে অভিহিত করেছে। সৌদি আরবও এই ঘটনার পর ভয়াবহ পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ঘটনায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে উরসুলা ফন ডার লেন এবং আন্তোনিও কস্তা উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ওপর জোর দিয়েছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক শান্তির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। তিনি ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সদিচ্ছার সাথে আলোচনায় ফেরার তাগিদ দেন।
এদিকে রাশিয়া ওয়াশিংটনের তীব্র সমালোচনা করেছে। মস্কোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে পারমাণবিক আলোচনার আড়ালে আসলে এই হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দিমিত্রি মেদভেদেভ মার্কিন পদক্ষেপকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে ইউক্রেন এই পরিস্থিতির জন্য ইরান সরকারকেই দায়ী করেছে। কিয়েভের মতে, গত কয়েক মাসে ইরানি জনগণের ওপর চালানো দমন-পীড়ন এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাই আজ দেশটিকে এই যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নরওয়ে অবশ্য ইসরায়েলের এই আগাম হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছে।
মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কায় রেড ক্রস এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রেড ক্রসের প্রেসিডেন্ট মিরজানা স্পোলজারিক সতর্ক করেছেন, এই সামরিক উত্তেজনা একটি বিপজ্জনক ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ বা শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হয়ে সামরিক পথ বেছে নেওয়ায় যুদ্ধের ভয়াবহতা এখন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমান এই সহিংসতায় হতাশা প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে যাতে তারা এই সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে না পড়ে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি মনে করেন, এই যুদ্ধ মার্কিন স্বার্থ বা বিশ্বশান্তি কোনোটিরই উপকারে আসবে না। এখন বিশ্ববাসীর নজর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দিকে, কারণ ক্রমবর্ধমান এই সংঘাত যদি এখনই থামানো না যায়, তবে তা একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক এবং সম্ভবত বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
কিউএনবি/অনিমা/০১ মার্চ ২০২৬,/সকাল ৬:০১